লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা রাজধানীর সবজির বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে চিনি, ডিম ও পেঁয়াজের দাম কমেছে। কেজিপ্রতি আলু ৫ ও মুরগির দাম ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। তবে মুদি পণ্যের দামে তেমন একটা পরিবর্তন আসেনি। গত সপ্তাহের দামেই আটা, ময়দা, চাল ও ডাল বিক্রি হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের বাজার ওঠানামার বেসামাল পরিস্থিতিতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। আবার পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
গতকাল শুক্রবার মালিবাগ বাজার, কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজারে আসা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেঁচে থাকার তাগিদে আয়ের চেয়ে তাদের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। চাহিদা মেটাতে ঋণ করতে হচ্ছে। আগে বাজার নিয়ে হাসিমুখে বাসায় ফিরতেন। এখন পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে বাজারের ব্যাগের পরিবর্তে ‘ঋণের ব্যাগ’ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরায় আলু প্রতি কেজি ২৩-২৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিতে ৫ টাকা কমে ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা কমেছে। গত সপ্তাহে ৭০-৭৫ টাকা করে বিক্রি হওয়া বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকায়। বরবটির মতো পটোল, করলা ও ঢেঁড়স কেজিতে ১০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকায়। ৩০-এর চিচিঙ্গা ২০-২৫, ৬০ টাকার লাউ ২০ টাকা কমে ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ ও বেগুনের দামও কেজিপ্রতি ২০ টাকা করে কমেছে।
শ্যামবাজারে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ভোক্তা আক্ষেপ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা না খেয়ে মরে যাব হয়তো! আজ সবজির বাড়ে তো কাল বাড়ে চালের দাম। আমাদের পকেটের অবস্থা খুবই খারাপ। পরিবার নিয়ে চলতে পারছি না। এসব কথা কাউকে বলতেও পারছি না, সইতেও পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাত্র ১৮ হাজার টাকায় একটা কোম্পানিতে চাকরি করছি। এ টাকায় আমার সবকিছু চালাতে হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলসহ দুই রুমের ভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ মিলিয়ে বাকি টাকায় কিছুই হয় না। গত এক মাসে ছেলের হাতে একবার মাত্র মুরগির গোস্ত দিতে পেরেছি। বলা চলে আমাদের খাবার রুটিন এখন আলুভর্তা-ডাল। বর্তমানে আলু, চাল-ডালের দামও বেড়েছে।’
কয়েক দোকান পার হতেই দেখা মাহবুব হোসেনের সঙ্গে। তিনি বাজারের ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে। ভেতরে এক কেজি ঢেঁড়স আর খানিকটা কচুর লতি। কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার হাতে এটি শুধু একটি বাজারের ব্যাগ নয়, এটি ঋণের বোঝা। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ঋণের টাকা নিয়ে বাজারে এসেছি। করোনায় চাকরি হারিয়ে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছি। স্ত্রী-তিন সন্তান নিয়ে আমার সংসার। পরিবারের খরচ দিনকে দিন বাড়ছে। আমার বেতনের উন্নতি হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এরই মধ্যে দুই মাসের বাসা ভাড়া আটকে গেছে। সব ঠিকঠাক রাখতে এখন পর্যন্ত অনেক ঋণ করেছি। তার ওপরে বাজারের দশায় আমাদের মতো মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন।’
এদিকে বাজারদর নিয়ে জানতে চাইলে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেন, বাজার ওঠানামার বিষয়টি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করতে পারলে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। আর চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হলেই দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়তি থাকে।
কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী রনি মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মোকামে কম দামে পাচ্ছি তাই স্বল্প লাভে ক্রেতাদেরও সন্তুষ্ট করতে পারছি। বেশি দামে মাল (পণ্য) কিনলেই ক্রেতারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে দাম ওঠানামার বিষয়টি চাহিদার ওপর নির্ভর করে।’
শ্যামবাজারের এক পাইকারি ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজার নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের পকেটের অবস্থাও খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন। এ সবজির দাম কমছে তো অন্যান্য কিছুর দাম বাড়ছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়ায় দাম কমতে শুরু করেছে। তবে পাইকারদের মজুদ প্রবণতার কারণে মুদি পণ্যের দাম বাড়ছে। তাই আমাদেরও বেশি দাম রাখতে হচ্ছে।’
কারওয়ান বাজারের মুরগি ও ডিমের দোকানে খবর নিয়ে দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে অন্তত ১০ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি ফার্মের মুরগি ১৫৫-১৬০ এবং প্রতি ডজন ডিম ১১৮-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারভেদে মহাখালী, বাড্ডা কাঁচাবাজার ও এর আশপাশের বাজারগুলোতে একই মুরগি প্রতি কেজি ১৬৫-১৭০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। পাকিস্তানি কক লাল মুরগি ৩০০-৩২০, কবুতর ছোট ২৫০ এবং বড় ৩০০ টাকায়, হাঁস প্রতিটি ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট ৭০-৭৫, ব্রি-২৮ ৫৭-৬০ ও নাজিরশাইল ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাল ব্যবসায়ী বলেন, ‘রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুরে দেশের সব চাল উৎপাদনকারী মিলের অবস্থান। সেখান থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হয় তাই আমাদের বিক্রিও বেশি থাকে। সরকার নিয়মিত মিলমালিকদের মনিটরিং করছে না বলেই বাজারের এই দশা।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে এমন বড় বড় অনেক কোম্পানি রয়েছে যারা তাদের গোডাউনে হাজার হাজার টন চাল-ধান মজুদ করে রেখে চালের বাজার অস্থির করে তুলেছে। এখন চালের দাম সব থেকে কম হওয়ার কথা। কিন্তু মজুদদারির কারণে দেশের মানুষ ও আমরা ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছি।’
এদিকে ময়দা, ডালডা, ছানা, গুঁড়োদুধের দাম বাড়ায় মিষ্টির মূল্যও বেড়েছে। রাজধানীতে ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ড দোকানে মিষ্টির দাম কেজিপ্রতি ৪০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিন ১৫ আগে ৩০০-৩৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া রসগোল্লা এখন ৩৯০-৪২০, ২২০ টাকার কালোজাম ২৫০-২৭০, ৪৮০ টাকার মালাইকারি ৫৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিষ্টি ও ড্রাইকেক তৈরির সব উপকরণের দাম বাড়ায় প্রতিটি কোম্পানি প্রকারভেদে পণ্যের মূল্য ৪০-১০০ টাকা বাড়িয়েছে। সাধারণ রসগোল্লা, সাদা ও কালোজাম, লাল রসগোল্লা, মিহিদানা, মতিচুর, লাড্ডু কেজিতে ২৫-৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
কাঁঠালবাগানে মিঠাই শোরুমের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত তিন দিনে কালোজাম, সাদা ও লাল রসগোল্লার দাম কেজিতে ২৫-৩০ টাকা বেড়েছে। ড্রাইকেকসহ সব বিস্কুটের দর ৮০-১০০ টাকা বেড়েছে। ১২০ টাকার বার্গার ১৪০, ৬০ টাকার প্যাটিস ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ড্রাই আইটেমের সব বিস্কুট কেজিতে ১০০ টাকা বেড়েছে। ৬৯৫ টাকার ড্রাইকেক ৭৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’ দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গুঁড়োদুধ, আটা, ময়দাসহ মিষ্টি তৈরির সব উপকরণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ কারণে আমাদের কোম্পানিও দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।’