গুটিকয়েক প্রতারণার ঘটনা ই-কমার্স খাতে আস্থার সংকট তৈরি করলেও এ খাতে সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, আগামী পাঁচ বছর দেশি ব্র্যান্ড ও উৎপাদনকারীদের জন্য অপার সম্ভাবনা রয়েছে ই-কমার্স খাতে। এজন্য ব্র্যান্ডের প্রতি সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ব্র্যান্ডকে ভোক্তার সঙ্গে সংযুক্ত করতে ই-কমার্স সাইটগুলোতে পণ্যের বিবরণ (কন্টেন্ট) সঠিকভাবে তুলে ধরার বিষয়ে নজর দিতে হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম আয়োজিত বাংলাদেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির প্রকৃত সম্ভাবনা, ট্রেন্ড এবং অনুশীলনগুলোকে উন্মোচিত করার লক্ষ্যে প্রথম আয়োজিত বাংলাদেশ ই-কমার্স সম্মেলন-২০২২ প্যানেল আলোচনায় এসব বক্তব্য উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, সততার সঙ্গে ব্যবসা এবং দ্রুত দক্ষ ডেলিভারি ব্যবস্থায় নতুনত্বের মাধ্যমে সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করতে পারলে ই-কমার্স খাত পুনরুদ্ধার হবে। ব্র্যান্ডের যতœ নেওয়ার আগে কাক্সিক্ষত ক্রেতাদের কীভাবে যতœ নিতে হবে সেটা অবশ্যই উদ্যোক্তাদের জানতে হবে।
‘ক্রিয়েটিং এ লাভ ল্যাংগুয়েজ বিটুইন প্রডাক্টস অ্যান্ড পিপল’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় আরও উঠে আসে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারীদের জন্য খাঁটি পণ্য পাওয়ার একমাত্র উৎস অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স খাত। কী পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চান সে অনুযায়ী নয়, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে মূল্যছাড় স্বল্প সময়ের জন্য ই-কমার্স সাইটের ভ্যালু বাড়ালেও বিক্রয় পরবর্তী উদ্ভাবনী সেবা দীর্ঘ মেয়াদে ভ্যালু যুক্ত করে। সেই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দেন বক্তারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাজগোজ ডটকমের কো-ফাউন্ডার ও সিসিও সিনথিয়া শারমিন ইসলাম বলেন, অনলাইনে ব্যবসা করার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধৈর্য। ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ডেলিভারিম্যান। সঠিকভাবে পণ্য পাঠানোর পরও ডেলিভারিম্যানের একটু দুর্ব্যবহারের কারণে কাস্টমার সন্তুষ্ট নাও হতে পারেন। এজন্য ডেলিভারিম্যানদের রিয়েল সার্ভিস প্রদানের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
সম্মেলনে বাংলাদেশে ই-কমার্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং করোনাকালে ই-কমার্স শিল্পের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে দেশের বৃহত্তর এবং বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের শুধু একত্রই করেনি সংযোগ স্থাপন করেছে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞ এবং রিটেইল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। নিজেদের মধ্যে মতবিনিময়ে এবং আলোচনায় তারা প্রকাশ করেছেন ই-কমার্স শিল্পের নানা প্রাসঙ্গিক ট্রেন্ড নিয়ে। সম্মেলনটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল একটি টেকসই ই-কমার্স ইকো-সিস্টেম গড়ে তোলা এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বিশ্বে ভোক্তাদের নিত্যনতুন উপায়ে পণ্য কেনার প্রবণতার ভিত্তিতে খুচরা বিক্রয় ব্যবস্থার ভবিষ্যত কী হতে যাচ্ছে সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম, দারাজ বাংলাদেশের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়াার্স অফিসার এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুস রুশো, ডটলাইনসের চিফ গ্রোথ অফিসার আশিকুর রহমান রিয়ান। ই-কমার্স সম্মেলনে তিনটি কিনোট সেশন, তিনটি প্যানেল আলোচনা, চারটি ইনসাইট সেশন, দুটি কেস স্টাডিজ, একটি ফায়ারসাইড চ্যাট এবং একটি ডিপ ডাইভ সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রসঙ্গত, ইভ্যালিসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত মডেলের ব্যবসায় ভোক্তাদের দেওয়া আগাম অর্থ আটকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত বছর দেশের উদীয়মান ই-কমার্স খাত বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়ে। ৩০-৩২টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এ খাতের অনেক উদ্যোক্তা ভোক্তাদের টাকা ফেরত দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা জারি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এস্ক্রো পদ্ধতি চালুর পর এ খাতের ক্রেতাদের কাছ থেকে আগাম টাকা নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এখন আর বড় ধরনের ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই।