কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মেরুদ-। আর কৃষকই হচ্ছে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার মূল কারিগর। স্বাধীনতা-উত্তর গত ৫০ বছরে এ দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় কৃষিতে অভাবনীয় সফলতা এসেছে। অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়েছে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। ঝড়, বৃষ্টি, খরা, অসময়ে বন্যা, অতিবৃষ্টি, উজানের ঢলে আগাম বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে এ দেশের কৃষক ফসল ফলায়। অনেক সময়ই কোনো ফসলের বাড়তি ফলন হলেই চাষিদের কপাল পুড়ে যায়। পানির দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কিংবা ক্ষেতেই ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থা প্রতিবছরই কোনো না কোনো পণ্যের বাড়তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঘটে। এ ধরনের সংকট নতুন নয়, অতি পুরনো। আর এভাবে কৃষক যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়, তখন সরকারিভাবে তাদের কোনো পৃষ্ঠপোষকতাও দেওয়া হয় না। ফলে কৃষক নিঃস্ব হয়ে ধারদেনা, ব্যাংকঋণ, এনজিও ঋণের টাকাও পরিশোধ করতে পারে না। উল্টো অন্য ফসলের চাষাবাদের জন্য আবার মহাজনী ঋণের ফাঁদে পড়তে হয়। ফলে কৃষকের কষ্টের শেষ থাকে না।
ঋণগ্রস্ত কৃষকের এই দুর্গতির উল্টোচিত্র দেখা যায় দেশের বড় বড় ঋণ গৃহীতা কিংবা শিল্প গ্রুপের বেলায়। এই পুঁজিপতিরা কোনো কারণে ব্যবসায় মন্দা হলে ঋণের টাকা পরিশোধে যখন ব্যর্থ হয়, তখন তাদের রুগ্ণ শিল্পের আওতায় এনে নানাভাবে সহায়তা দেওয়া হয়। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বড় গ্রাহকদের প্রায় সাড়ে ৯১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে নবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরই নবায়ন করা হয় ১১ হাজার কোটি টাকা। তারপরও গত এক বছরে বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে গত ডিসেম্বরে বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যা এ খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় সাড়ে ৪৬ শতাংশ। সূত্র মতে, বড় গ্রাহকদের ঋণে বেশি খেলাপি হয়েছে জনতা, এবি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৭৪ থেকে ৮৯ শতাংশই খেলাপি। উল্লেখ্য, বড় গ্রাহকদের খেলাপিমুক্ত রাখতে কয়েক বছর ধরে একের পর এক দেওয়া হয়েছে নানা কৌশলে ছাড়। তারপরও কখনো সম্ভব হয়নি খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো। সংশ্লিষ্টরা জানান, নানাভাবে বড় গ্রাহকদের ছাড়ের আওতায় ঋণ নবায়ন করা না হলে তাদের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা বড় গ্রাহকদেরই বেশি। তাদের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা থাকার পরও ঋণ পরিশোধে নানাভাবে টালবাহানা করে। এমনকি পুনরায় নতুন কৌশলে ব্যাংক থেকে সুবিধা আদায়ের ধান্ধায় থাকে।
অথচ বৈশ্বিক মহামারী করোনার সময়ে মাত্র ৪৩৫ কোটি ২৫ লাখ ৯০ হাজার টাকার ঋণের দায়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২১১ জন কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সারা দেশে কৃষকদের বিরুদ্ধে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৪টি সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করে। সূত্র মতে, ২০২০ ও ২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি মামলা করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। গত ২ বছরে বিশেষায়িত এ ব্যাংকটি ৫ হাজার ২৩টি মামলা করেছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ২ হাজার ৭৯৮টি ও ২০২১ সালে ২ হাজার ২২৫টি। অথচ এই দুই বছর ছিল করোনা মহামারীর মহাপ্রকোপ। চতুর্দিকে শুধু করোনার মৃত্যু আতঙ্ক মানুষকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। দেওয়া হয়েছে লকডাউন। রেল, বাস, সাধারণ পরিবহন পর্যন্ত মাসের পর মাস বন্ধ ছিল। কৃষক চাষাবাদ করেও চলাচলের অভাবে শ্রমিক সংকটে ধান পর্যন্ত কাটতে পারেনি। বাধ্য হয়ে সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় বাসে করে শ্রমিক দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে কৃষকের ফসল কাটার ব্যবস্থা করেছিল। কার অজানা আছে ভয়ংকর সেই দিনগুলোর কথা? দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। হাটবাজার ছিল জনমানবশূন্য। চতুর্দিকে শুধু মানুষের বেঁচে থাকার করুণ আকুতি!
অথচ মহামারীর এমন ক্রান্তিকালেই ব্যাংকগুলো কৃষকের বিরুদ্ধে মাত্র ৫০০ কোটি টাকারও নিচে কৃষিঋণের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা দায়ের করেছে। পক্ষান্তরে ছোট-বড় ব্যবসায়ী আর শিল্পপতিদের ঋণের বিপরীতে ৪ শতাংশ সুদে দেওয়া হয়েছে প্রণোদনা ঋণ। বলা হলো অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশেষ এই প্রণোদনা দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। অবশ্যই আমরা দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রণোদনার বিরোধিতা করি না। কিন্তু কৃষকদের ঋণের বিপরীতে তো কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। কিংবা কৃষিঋণের সুদ মওকুফ কিংবা কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়নি। যদি হাজার হাজার কোটি টাকা বড় গ্রাহকদের ও শিল্প গ্রুপগুলোকে বাঁচাতে ঋণ পুনঃতফসিলকরণ কিংবা প্রণোদনা দেওয়া হয়, তার বিপরীতে দেশের অর্থনীতির মেরুদ- কৃষকের কল্যাণে সরকার কী করেছে? কিছুই করেনি, তবে উপহার হিসেবে লক্ষাধিক কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করিয়ে কোমরে রশি বেঁধে আদালতে দাঁড় করানো হয়েছে। এই হচ্ছে আমাদের দেশের কৃষকের অভাবনীয় সফলতা অর্জনের পুরস্কার!
আবার আইনের প্রতিপালনে ব্যাংকগুলো কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করতেও বাধ্য হয় মর্মে দাবি করেছেন ব্যাংকাররা। যেমন ‘দ্য পাবলিক ডিমান্ড রিকোভারি অ্যাক্টের’ (পিডিআর) আওতায় কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা করতে পারে সরকারি ব্যাংকগুলো। আবার যদি কোনো কৃষক ঋণ নিয়ে তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ না করে তাহলে সে ঋণ তামাদি হয়ে যায়। অর্থাৎ তামাদি হওয়ার কারণে সেই কৃষকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা রুজু করা যাবে না। তাই বিদ্যমান আইনের প্রতিপালন ও টাকা আদায়ের স্বার্থে ব্যাংকগুলো মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয় মর্মে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করে। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কৃষকের অবদান অনেক। তাই ৫, ১০ ও ২০ হাজার টাকার জন্য কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ব্যক্তিগতভাবে আমি পছন্দও করি না মর্মে তিনি মন্তব্য করেন। কিন্তু আইন রক্ষার জন্য বাধ্য হয়েই আমাদের মামলা করতে হয়।
অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝে মধ্যে কৃষকদের ঋণ পরিশোধে কিছু কিছু সুবিধা দিয়ে থাকে। যেমন গত মাসে সমঝোতার (সোলেনামা) মাধ্যমে সার্টিফিকেট মামলা স্থগিত বা নিষ্পত্তি করে কৃষকের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিতে আবারও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ঐ সার্কুলারে বলা হয়েছে, স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ব্যাংক নিজেই ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিল করতেও পারবে। ক্ষেত্র বিশেষে বিনা ডাউন পেমেন্টেও কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের তারিখ থেকে ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল করতে পারবে। আগে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, এমন ঋণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো পুনরায় এ সুযোগ দিতে পারবে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা জারি করলেও ব্যাংকগুলো তা প্রতিপালন করে না। উল্টো মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত করে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, কৃষকদের বিরুদ্ধে যাতে মামলা করতে না হয় সে জন্যই বিভিন্ন সময়ে কৃষিঋণ পুনঃতফসিলে ছাড় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো ব্যাংক কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়লে সে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে মর্মে তিনি মন্তব্য করেন। বাস্তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কোনো সময় নেওয়া হয়ে থাকলে, বা ভবিষ্যতে নেওয়া হলেও এ দেশের কৃষক তা আদৌ জানবেন না।
অন্যদিকে, খেয়াল করা দরকার ঋণ পরিশোধে বড় গ্রাহকদের চেয়ে কৃষকরাই এখনো এগিয়ে রয়েছেন, সেহেতু সরকার প্রতি বছরই কৃষি খাতে যে ভর্তুকি দিয়ে থাকে, সেখান থেকে একটা যৌক্তিক পরিমাণ অর্থ কৃষিঋণের সুদ মওকুফের জন্য বরাদ্দ রেখে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দিলে কৃষকের কৃষিঋণের সুদ মওকুফ করা সম্ভব হতো। আবার ব্যাংকগুলো যেহেতু হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতি বছরই লাভ করে, সে অর্থ থেকেও কৃষিঋণের সুদ মওকুফের একটি অংশ বরাদ্দ রাখলে কৃষককে যেমন সহায়তা দেওয়া যাবে, তেমনি কৃষিতেও আরও সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে। আমরা মনে করি, কৃষকদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করা অমানবিক এবং অযৌক্তিক। ফলে লক্ষাধিক কৃষককে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুরো মামলা প্রত্যাহার করে তাদের দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দেওয়াই হবে সঠিক, সময়োচিত ও কৃষি অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ। সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক কৃষি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক