ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় অযোগ্য ২৪ ব্যাংক

ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা ব্যবসা চালু করতে ব্যাংকইন্স্যুরেন্স নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার বিতরণকৃত মোট ঋণের ৫ শতাংশের বেশি হলে সেসব ব্যাংক ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসা করতে পারবে না। এটি আমলে নেওয়া হলে ২৪টি ব্যাংক এ ব্যবসায় অযোগ্য বিবেচিত হবে। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।   

ব্যাংক এবং বীমাকারীদের মধ্যে একটি অংশীদারত্ব হচ্ছে ব্যাংকইন্স্যুরেন্স। ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বীমা ব্যবসার প্রচার করতে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত ‘ব্যাংকইন্সুরেন্স’ নির্দেশিকার আওতায় বিভিন্ন বীমা কোম্পানির প্রডাক্ট ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকের কাছে বিক্রি করবে। ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রি করা বীমা পণ্য জনপ্রিয়তা পাওয়ায় এটিকে বলা হয় ‘ব্যাংকইন্সুরেন্স’।

দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৮১টি বীমা কোম্পানি থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা করার আগ্রহ কম। বীমা কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম, বীমা দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা সর্বোপরি প্রচারণার অভাবে দেশের বীমা শিল্প পিছিয়ে আছে। বতর্মানে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশেরও কম। বীমায় জনসাধারণের আগ্রহ বাড়াতে ব্যাংক ইন্স্যুরেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী, এ ব্যবসা করতে হলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৫ শতাংশের বেশি। এরমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি বিশেষায়িত ৩টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি। এর বাইরে বেসরকারি ৪৩ ব্যাংকের মধ্যে ১৩টি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দুটির খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে এই ২৪টি ব্যাংক খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নীত না করা পর্যন্ত ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসার জন্য ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ হারের (সিআরআর) অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণ ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম হতে পারবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত মূলধন কাঠামো রেটিং গ্রেড (ব্যাসেল-৩) অনুসারে ক্রেডিট রেটিং-২ এর চেয়ে কম হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত ন্যূনতম ক্যামেলস রেটিং-২ পূরণ করবে। এছাড়া ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসার অনুমোদন পেতে হলে ব্যাংকগুলোকে সর্বশেষ তিন বছর ইতিবাচক নিট মুনাফায় থাকতে হবে। এ ব্যবসার জন্য ব্যাংকগুলোর একটি কার্যকর ব্যাংকইন্স্যুরেন্স ব্যবসার পরিকল্পনাও থাকতে হবে।

একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ তিনটি জীবন বীমা ও তিনটি সাধারণ বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে একটি মডেলের মাধ্যমে ব্যবসা করতে হবে। তার জন্য ব্যাংকে আলাদা একটি বিভাগ খুলতে হবে, যার অধীনে ব্যাংক গ্রাহকরা বীমা পণ্য ক্রয় করতে পারবেন। প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমতির রেজুলেশনের কপিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে।

ব্যাংক এবং বীমাকারীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ব্যাংকইন্সুরেন্স এজেন্সি চুক্তির একটি অনুলিপি বীমা কোম্পানি ও ব্যাংকের আইনজীবী দ্বারা যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি পাওয়ার পর বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএতে করপোরেট এজেন্ট লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। আইডিআরএ থেকে লাইসেন্স পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করবে ব্যাংক।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে,  করপোরেট এজেন্ট লাইসেন্স পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে আইডিআরএর সব প্রবিধান মেনে চলতে হবে। ব্যাংকইন্সুরেন্সের প্রধান কর্মকর্তাকে কোনো স্বীকৃত বিশ^বিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতকোত্তর বা সমমানের ডিগ্রিধারী হতে হবে, যেটি বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন  বা বিদেশের অধিভুক্ত বিশ^বিদ্যালয় স্বীকৃত। এছাড়াও প্রধান কর্মকর্তাকে ব্যাংকিং অথবা বীমা কোম্পানিতে কমপক্ষে ১২ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

প্রধান ব্যাংকইন্সুরেন্স কর্মকর্তার পদমর্যাদা হবে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) নিচের পাঁচটি গ্রেডের মধ্যে। ওই কর্মকর্তাকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও সনদ থাকতে হবে।

ব্যাংক বীমাকারীর অনুরোধে দাবি নিষ্পত্তি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। নির্দেশিকা অনুসারে বীমাকারী সরাসরি বীমাকৃত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির সঙ্গে, যেটি প্রযোজ্য ব্যাংককে জানানো সাপেক্ষে নিষ্পত্তি করবে। ব্যাংক গ্রাহকের জন্য বীমা পণ্যের উপযুক্ততা পরীক্ষা করবে। বীমা প্রিমিয়ামের কমিশন বীমাকারী এবং ব্যাংকের মধ্যে আইডিআরএ নির্ধারিত প্রবিধানের চুক্তি অনুসারে প্রদান করা হবে।

৭০ এর দশকে ফ্রান্সে ব্যাংকইন্স্যুরেন্স শুরু হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও অন্তত দুই দশক আগে এর প্রচলন দেখা যায়। বাংলাদেশে এখন বেসরকারিভাবে ৩৪টি জীবন বীমা এবং ৪৫টি সাধারণ বীমা কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে সরকারি মালিকানাধীন জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা করপোরেশন নামে দুটি বীমা কোম্পানি রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৬০টি ব্যাংকের ১১ হাজারের বেশি শাখা রয়েছে সারা দেশে।