সড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগেও আশানুরূপ সুফল মিলছে না। গত কয়েক মাস ধরেই দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এপ্রিলের মতো মে মাসেও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যায় শীর্ষে মোটরসাইকেল। ২৪৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২৭৯ জন, যা মোট নিহতের ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এছাড়া মে মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫২৮টি। এতে নিহত ও আহত হয়েছে যথাক্রমে ৬৪১ ও ১ হাজার ৩৬৪ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৮৪, শিশু ৯৭।
গতকাল সোমবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রোড সেফটির মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি নয়টি জাতীয় দৈনিক, সাতটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২৭৯ জন নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। বাসযাত্রী ৫৭ জন, যা মোট নিহতের ৮.৮৯ শতাংশ। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-ক্রেনগাড়ি আরোহী ৩৯ জন, যা মোট নিহতের ৬.০৮ শতাংশ। মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-অ্যাম্বুলেন্স-পুলিশ জিপযাত্রী ২৩ জন, যা মোট নিহতের ৩.৫৮ শতাংশ। থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজিচালিত অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পো-লেগুনা) ৯৪ জন, যা মোট নিহতের ১৪.৬৬ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-মাহিন্দ্র-টমটম) ১৩ জন, যা মোট নিহতের ২.০২ শতাংশ এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-প্যাডেল ভ্যান আরোহী ১৭ জন, যা মোট নিহতের ২.৬৫ শতাংশ হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২১৭টি জাতীয় মহাসড়কে, ১৯১টি আঞ্চলিক সড়কে, ৭৪টি গ্রামীণ সড়কে এবং ৪৬টি শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন হিসেবে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহের ১১১টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২১৪টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১২৩টি পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেওয়া, ৬১টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৯টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৫.৩০ শতাংশ, সকালে ২৯.৩৫ শতাংশ, দুপুরে ২২.৫৩ শতাংশ, বিকেলে ১৭.৮০ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১.১৭ শতাংশ এবং রাতে ১৩.৮২ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। এই বিভাগে ১২৭টি দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত হয়েছে। তবে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ২২টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত হয়েছে। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ৩২টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত। সবচেয়ে কম ঝালকাঠি জেলায়। সেখানে তিনটি দুর্ঘটনায় দুজন আহত হয়েছে, প্রাণহানি ঘটেনি। রাজধানী ঢাকায় ২৩টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের পেশাগত পরিচয়ে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৫, বিমানবাহিনীর সদস্য ১, নৌবাহিনীর সদস্য ১, সাবেক সেনাসদস্য ১, সাবেক বিডিআর সদস্য ১, আনসার সদস্য ২, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক ২৩, চিকিৎসক ৪, সাংবাদিক ৬, আইনজীবী ৪, প্রকৌশলী ৩, স্থানীয় পর্যটক ৩, বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী ১২, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৭, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৯, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৩৭, পোশাক শ্রমিক ৯, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারী ২, রংমিস্ত্রি ২, ধানকাটা শ্রমিক ১৩, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৬ এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ হিসাব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোসহ বেশ কয়েকটি কারণ দেওয়া হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় গত মে মাসে প্রতিদিন গড়ে ২০.৬৭ জন নিহত হয়েছে। এপ্রিল মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৮ জন। এই হিসাবে এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে প্রাণহানি বেড়েছে ১৪.১৯ শতাংশ। তবে ট্রাকসহ পণ্যবাহী দ্রুতগতির যানবাহন ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আমাদের ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গণপরিবহন সহজ, সাশ্রয়ী ও উন্নত করে, যানজট কমিয়ে মোটরসাইকেল নিরুৎসাহিত করা অতীব জরুরি। কিন্তু এটা না করে মোটরসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এ অবস্থার উন্নয়নে টেকসই সড়ক পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।’