ক্ষতিকর পোকাসহ তুলা আমদানিতে রাজি বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বল উইভিল নামের পোকাযুক্ত তুলা আমদানিতে সায় দিয়েছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য ক্ষতিকর বল উইভিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও মারাত্মক প্রজাতির একটি কীট। তাপ দিয়ে তুলাকে পোকামুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলেও এই পোকার ডিম, লার্ভা ১১ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তারপরও সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই তুলা আমদানিতে সায় দিয়েছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড।

যখন কোনো কৃষিপণ্য বিদেশ থেকে আনা হয়, তখন তার মধ্যে  কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস আছে কি-না তা তাপ দিয়ে দুইবার পরীক্ষা করা হলো ফিউমিগেশন। তবে ফিউমিগেশনের পরও বল উইভিলের ডিম বা লার্ভা নষ্ট হয় না। আগে যুক্তরাষ্ট্র বল উইভিল পোকাযুক্ত তুলা রপ্তানি করত না। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পোকামুক্ত তুলা রপ্তানির নিশ্চয়তা দিয়ে বাংলাদেশকে ফিউমিগেশনের শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায়।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেয়। এরপর এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা চেয়ে চিঠি দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ জন্য গত ২৪ মে কৃষি মন্ত্রণালয় বৈঠক করে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদ্যমান কোয়ারেন্টাইন বিধিমালা (ডাবল ফিউমিগেশন) সঠিকভাবে প্রয়োগ, যাচাই-বাছাই নিয়ে আলোচনা হয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের শর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোকাযুক্ত তুলা আমদানির পক্ষে মতামত দেন।

বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, তুলা বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের অ্যানিমেল অ্যান্ড প্ল্যান্ট হেলথ ইন্সপেকশন (এপিএইচআইএস) সার্ভিসের সনদ দিলেও বাংলাদেশে আসার পর পোকার উপস্থিতি পাওয়া গেলে তা অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ চান। এই শর্ত মানলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন। সভায় উপস্থিত সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সেলের মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন রাজ্য বল উইভিল পোকামুক্ত সে বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে জানাতে পারেনি। তবে বল উইভিলমুক্ত বলে তারা সনদ দিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও এপিএইচআইএস অথবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রের পরও তুলা বাংলাদেশে আনার পর তা বন্দরে যাচাই-বাছাই করে পোকার উপস্থিতি পাওয়া গেলে তা ফিউমিগেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো যেতে পারে।

জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ৭৬ লাখ বেল তুলা আমদানি করা হয়েছে। আর এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বাংলাদেশ হবে তুলার অন্যতম আমদানিকারক দেশ।

গত বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহযোগিতা সংস্থা (ওইসিডি) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ প্রতিবেদন ‘এগ্রিকালচারাল আউটলুক-২০২১-২০৩০’-এ তুলার বাজার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তুলার বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় আমদানিকারকে পরিণত হওয়ার কারণ হিসেবে সুতি কাপড় ও  তৈরি পোশাক উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি অনুযায়ী সে দেশের তুলা আমদানির ক্ষেত্রে ডাবল ফিউমিগেশনের শর্ত শিথিল করার জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ফিউমিগেশন প্রক্রিয়া ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি করে কি-না তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন উইংয়ের পরিচালক রণজিত কুমার পাল সভায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তুলা রপ্তানি অঞ্চলকে পোকামুক্ত ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সনদ পেতে হবে। তারপরও ফিউমিগেশন প্রক্রিয়া সম্পাদন করে তুলা আমদানি করা যেতে পারে।

সভায় অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) ডা. মো. আবদুর রৌফ বলেন, তুলার বল উইভিল পোকা এতটাই মারাত্মক যে সেটা ফুল, ফল, মরিচ, আলু, বেগুন, টমেটোর মতো যেকোনো ফসলকে নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই বিদেশ থেকে তুলা আমদানির ক্ষেত্রে ফিউমিগেশন অথবা কোনো জীবাণু বা পোকা থাকলে তা উচ্চ তাপমাত্রায় ধ্বংস করতে হবে।

গত ২ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব পরামর্শক সভায় তুলার বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানেও সরেজমিন পরিদর্শন করে দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ফিউমিগেশনের বাধ্যবাধকতা কেস টু কেস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তুলার ওপর থেকে ফিউমিগেশন তুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে সায় দেওয়া হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বারবার রিকোয়েস্ট করেছে ফিউমিগেশন সিস্টেমটা তুলে দিতে। কিন্তু আমাদের বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, আমেরিকার তুলার মধ্যে এক ধরনের পোকা থাকে। এ পোকা যদি এয়ারে চলে যায় তাহলে আমাদের দেশের শুধু তুলা না অন্য প্ল্যান্টেও বা ফলেও ম্যাসিভ নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারে।’