অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নেই ১২৭৩ কলকারখানায়

ঢাকাসহ সারা দেশে ১ হাজার ২৭৩টি কলকারখানায় অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম নেই। মাস পাঁচেক আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্নি-দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে চিঠি দিলেও কাজ হচ্ছে না।

গত শনিবার রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। পরদিন গত রবিবার পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠক থেকে যেসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম রাখা ছাড়াও অন্যান্য নিয়ম মানবে না তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। বড় বড় কলকারখানা বা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম রাখতেই হবে। ফায়ারের কোড বা নিয়ম মানতে হবে। আমাদের কাছে তথ্য আছে কিছু বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম নেই। এ নিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা অনিয়ম করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশের একাধিক টিম এক বছর ধরে অগ্নিকা- নিয়ে কাজ করেছে। তাদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১ হাজার ২৭৩টি কল-কারখানা কর্তৃপক্ষ নিয়ম মানছে না। যেভাবে ভবন তৈরি করার কথা তা করা হয়নি। এমনকি আগুন নেভানোর সরঞ্জাম পর্যন্ত নেই। এ সংক্রান্ত একটি তালিকা করা হয়েছে। তালিকাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে তারা যাতে নিয়ম মেনে অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম স্থাপন করে। এছাড়া মাসে একবার করে হলেও মহড়া দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু কেউ তাদের নির্দেশনা মানছে না। ফায়ার সার্ভিসও তাদের এ নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সীতাকুন্ডের আগুনের ঘটনার পর এখন সময় এসেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। শিগগির অভিযান চালানো হবে বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ১ হাজার ২৭৩টি কল-কারখানায় তালিকায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী এলাকার প্রতিষ্ঠানই বেশি।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কল-কারখানাগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। পরিদর্শকরা নিয়মিত কারখানাগুলো পরিদর্শন করেন। অনেক কারখানা সনদ নেওয়ার পরও অগ্নিনিরাপত্তার দিকে নজর দেয় না। অনেক ভবন মালিক আইন মেনে ভবন তৈরি করেন না। আইন না মেনে নিজেদের খেয়াল খুশিমতো তৈরি করেন। চিঠি দিয়েও ভবন মালিকদেরও সাড়া পাওয়া যায় না। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে।

গত সোমবার ঢাকার উত্তরখানে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কারখানায় স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। পানির ব্যবস্থা, গ্যাস মাস্ক, ডিটেক্টর, আলাদা বহির্গমন পথ, ভবনের ওপরে ও নিচে সংরক্ষিত পানির ব্যবস্থা, ফায়ার এক্সটিংগুইশারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। কোথাও কোথাও লোক দেখানো দুয়েকটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার ঝোলানো থাকলেও এসবের মেয়াদ নেই। আগুনের মহড়া দেওয়াসহ এ সম্পর্কে কোনো সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সহায়-সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। সীতাকুন্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগার পর সরকারের হাইকমান্ড, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের টনক নড়েছে। এর আগেও পুরান ঢাকার নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশন ও কাঁচপুরের সেজান জুস কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রত্যেকটির পর তদন্ত হয়েছে, মামলা হয়েছে। কিন্তু তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন বা দোষীদের শাস্তি হয়নি।

ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের চালানো তদন্তে তালিকাভুক্ত কারখানাগুলোতে ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি বাতি, ধোঁয়া শনাক্তের যন্ত্র, আগুন প্রতিরোধী কম্বল, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, টর্চ লাইটসহ যেসব অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম থাকার দরকার সেগুলো নেই। থাকলেও নামকাওয়াস্তে। তারা আরও বলেন, গাজীপুরে ছোট-বড় অন্তত আড়াই হাজার শিল্পকারখানা আছে। এখনো ৪০ ভাগ কারখানার মালিক নিয়ম মানেন না।

শিল্প পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহপরিদর্শক মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব কল-কারখানা নিয়মকানুন মানবে না তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম থাকতে হবে। বিষয়টি আরও মনিটরিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব কল-কারখানায় আগুন নেভানোর সরঞ্জাম নেই সেগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। ফায়ার সার্ভিসের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। আর না হয় বড় ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।’