ফের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে পোশাক খাত

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুনের ঘটনায় বাংলাদেশের পোশাক খাত আবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। এর আগে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় আগুন ও রানা প্লাজা ধসের পর বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর তরফ থেকে নানা শর্তের বেড়াজালে পড়তে হয়েছিল।

গত শনিবার রাতে বিএম ডিপোতে আগুন লাগে, যা নেভাতে ৮৬ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জন ফায়ার সার্ভিসকর্মী, ডিপো শ্রমিকসহ ৪৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। আহতদের মধ্যে বেশিরভাই দগ্ধ। এ ছাড়া পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পুুড়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএ সূত্র জানায়, অগ্নিকান্ডে ভস্মীভূত হওয়া কনটেইনার ডিপোতে ৮০টি তৈরি পোশাক কারখানার ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের রপ্তানি পণ্য ছিল বলে এখন পর্যন্ত তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পণ্য থেকে কী পরিমাণ পণ্য শিপমেন্ট হয়েছে, কত পুড়েছে আর কত অক্ষত রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। তাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকরা।

বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের ১৮ ব্রিগেডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের জানান, ডিপোর আগুন পুরোপুরি নিভেছে। এখন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কনটেইনারগুলো সরানোর কাজ চলছে। আগুনে প্রায় ৪০০ কনটেইনার ধ্বংস হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে থাকা রাসায়নিকের কনটেইনারগুলোই ছিল আগুন লাগার বড় কারণ। রাসায়নিকের যেসব কনটেইনার আমরা শনাক্ত করেছি, সেগুলো আলাদা করে ফেলেছি। যে কারণে আগুন আর বাড়তে পারেনি। তা ছাড়া যেসব কনটেইনারে আগুন লেগেছিল তার পাশে কিছু কনটেইনার অক্ষত ছিল। সেগুলোও আমরা নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়েছি।’  বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) সূত্র জানায়, অগ্নিকা-ের সময় বিএম কনটেইনার ডিপোতে মোট ৪ হাজার ৩০০টি কনটেইনার ছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার ছিল খালি। বাকি ১ হাজার ৩০০টির মধ্যে ৮০০ কনটেইনারে রপ্তানির পণ্য ও ৫০০ কনটেইনারে আমদানির পণ্য রাখা ছিল। রপ্তানির পণ্যের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পোশাক পণ্য ছিল। আগুন নেভানোর পর তালিকা করলেই বোঝা যাবে কী পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়েছে আর কী পরিমাণ অক্ষত আছে।

বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর এই ভয়াবহ আগুনে রপ্তানি পণ্য ধ্বংস ও মর্মান্তিক প্রাণহানির সংবাদ প্রচারিত হয়েছে বিবিসি, সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যে কারণে পোশাকের বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনগুলোর মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আর্থিক ক্ষতিই মুখ্য নয়। এর মাধ্যমে বিশ্ববাণিজ্যে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে যাতে অন্য কোনো ডিপোতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য ডিপো কর্তৃপক্ষ, বন্দর, কাস্টমস, বন্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যথাযথ তদারকি প্রয়োজন।’ আগুনের ঘটনায় কী পরিমাণ রপ্তানি পোশাক পুড়েছে তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানাতে হবে। তাই দু-এক দিনের মধ্যে কাস্টমস এবং ডিপো কর্তৃপক্ষকে আমরা ডিপোতে থাকা পণ্যের প্রকৃত অবস্থা জানানোর জন্য চিঠি দেব।’

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, আগুনের ঘটনার পর বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ওই ডিপোতে কোন প্রতিষ্ঠানের কী পরিমাণ পণ্য ছিল তার তথ্য চেয়ে সদস্যদের কাছে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৮০ প্রতিষ্ঠানের ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য ছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।

বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি ও গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকা-ে ব্যাপক প্রাণহানি ও রপ্তানি পোশাক পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশের পোশাকশিল্প আবারও নতুন করে ইমেজসংকটে পড়বে।’ তিনি বলেন, তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর দেশের রপ্তানি পোশাকশিল্পকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। ওই সময় বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের দেওয়া কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণ করতে পেরেছে, তারাও করোনাকালে প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে লড়াই করে এখন পর্যন্ত টিকে আছে। সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিও পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নাছির বলেন, বিএম ডিপোর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) ও পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ সুরক্ষায় বিদেশি ক্রেতা, উৎপাদনকারী ও ট্রেড ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ তদারক সংস্থা আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) অফডকগুলোর কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে নতুন করে শর্ত আরোপ করতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। ওই বছর অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে যায়। ২০২১ সালে ৩ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বাংলাদেশ। বরাবরের মতো পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থান রয়েছে চীনের দখলে।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর বিশ^বাজারে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশের পোশাক খাত। ওই সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংগঠনের চাপে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতারা এখানকার পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশকে সামনে নিয়ে আসে। এরপর ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও মার্কিন ক্রেতাদের সংগঠন অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা পোশাক কারখানাগুলোর ওপর বেশ কিছু শর্ত আরোপ করে। ২০১৮ সালে কার্যক্রম শেষ করার কথা থাকলেও ২০২০ সালের জুনে বিদেশি ক্রেতা, উৎপাদনকারী ও ট্রেড ইউনিয়নের সমন্বয়ে নবগঠিত যৌথ তদারক সংস্থা আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিলের (আরএসসি) কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে তারা।