দেশে প্রতি তিনজনে একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। সে হিসাবে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে ভুগছেন। এদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষ সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। দেশে মোট মৃত্যুর ২ দশমিক ৮২ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে লিভারের কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি ৩২-৩৫ শতাংশ বাংলাদেশে এবং সবচেয়ে কম পাকিস্তানে ১৪ শতাংশ। লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) লিভার বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মবিন খান বলেন, এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে ২০৩০ সালে ফ্যাটি লিভারজনিত ব্যাধি নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস বা ন্যাশের (এনএএসএইচ) প্রাদুর্ভাব ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। শুধু ওজন কমিয়েই এই রোগগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব। ওজন কমানোর জন্য প্রয়োজন জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নিয়মিত শরীরচর্চা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন।
হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্যমতে, লিভারের যত প্রকার রোগ হয় তার মধ্যে সবচেয়ে কমন হল ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। পৃথিবীতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। সাধারণ মানুষের প্রায় ২৫ শতাংশ লিভারে ফ্যাট নিয়ে ঘুরছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় ১৩-১৪ শতাংশ, ইউরোপে ২-১০ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্যে ২০-৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ৫-৩০ শতাংশ মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।
এই সংগঠনের তথ্যমতে, ফ্যাটি লিভার থেকে লিভার প্রদাহ সৃষ্টি হলে তাকে বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস বা ন্যাশ। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ফ্যাটি লিভার রোগীদের মধ্যে ৯-৫৩ শতাংশ মানুষ ন্যাশে আক্রান্ত। শ্রীলঙ্কায় ন্যাশের প্রাদুর্ভাব ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারতে ৯-৫৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ৪২-৫৩ শতাংশ। ন্যাশে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে রোগ আরও অগ্রসর হয়ে লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যানসার হতে পারে। এমনকি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ন্যাশের রোগী লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো ন্যাশ।
ডায়াবেটিস রোগীদের অর্ধেক ফ্যাটি লিভার : হেপাটোলজি সোসাইটির গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব প্রায় ৫০ শতাংশ। ফ্যাটি লিভার প্রাদুর্ভাব বিভিন্ন শারীরিক গঠন, বয়স, লিঙ্গ ও শরীরে অন্যান্য রোগের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফ্যাটি লিভার সাধারণত তাদের বেশি হয় যাদের ওজন বেশি। তবে যাদের ওজন স্বাভাবিক তাদেরও লিভারে ফ্যাট জমতে পারে। বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভার আক্রান্ত মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশের ওজন স্বাভাবিক সীমার মধ্যে এবং বাকিদের ওজন স্বাভাবিক সীমার চেয়ে বেশি। তার মধ্যে আবার ৫৩ দশমিক ১৯ শতাংশ রোগীর ন্যাশ পাওয়া যায়। স্বাভাবিক ওজনের ফ্যাটি লিভার রোগীদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা এবং অতিরিক্ত ওজনের ফ্যাটি লিভার রোগীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা অধিক। শিশু-কিশোর, নারী এবং মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি।
দেশে মানুষের ওজন বাড়ছে : হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের প্রাদুর্ভাব ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং নারীদের মধ্যে ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে। শিশু-কিশোরদের ওজন বৃদ্ধির হার আরও অনেক বেশি। উক্ত সময়ে শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের প্রাদুর্ভাব শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে এবং ছেলেশিশুদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বিপদসংকেত।
ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে পরামর্শ : হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বিএসএমএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধে কর্মপন্থা নির্ধারণে প্রত্যেক ব্যক্তির সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন এবং প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে হাঁটা উচিত।
এ ছাড়া ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে হেপাটোলজি সোসাইটি ১১টি পরামর্শ দিয়েছে। এগুলো হলো দড়ি লাফ এবং সাইকেল চালানো, দুধ, ফল, শাকসবজি খাওয়া বাড়ানো, চিনিযুক্ত খাবার, পানীয়, চকলেট, আইসক্রিম, ফাস্টফুড খাওয়া কমানো, শরীরচর্চা বাড়ানো যায় এ রকম পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রতিটি স্কুল এবং প্রশাসনিক ওয়ার্ডে খেলার মাঠ রাখা, প্রতিটি শিশুকে খেলতে এবং অন্যান্য শারীরিক কর্মকা-ে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করা, প্রধান সড়কের পাশে বাইসাইকেল চালানো এবং হাঁটার জন্য আলাদা লেন তৈরি করা, প্রক্রিয়াজাত খাবারের পুষ্টিমান সঠিক রাখতে খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের অধীনে আনা, সফট ড্রিংকসের পরিবর্তে ফ্রেশ ফলের জুস এবং পানি পানকে উৎসাহিত করা, ছোট-বড় সবার জন্য পার্ক, খেলার মাঠ, স্কুল এবং কর্মস্থলে পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা করা, প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ে পুষ্টিমান এবং শক্তিমান (ক্যালরি) উল্লেখ করা ইত্যাদি।
আজ বিশ্ব ফ্যাটি লিভার বা ন্যাশ দিবস : এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘স্টপ ন্যাশ নাও’ অর্থাৎ ‘এখনই বন্ধ কর ন্যাশ’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শাহবাগের জাদুঘরের সামনের সড়কে শোভাযাত্রা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সমঝোতা স্মারক ও সচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়নে ‘বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করে হেপাটোলজি সোসাইটি। এতে সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মবিন খান।