পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের বরাদ্দ বাড়ছে

দেশে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, ‘পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে আমি আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮১ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। বর্তমান ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে ৭২ হাজার ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটের ১২ শতাংশ বরাদ্দ এ খাতে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার নিরাপদ, টেকসই পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে সদা সচেষ্ট আছে। আমরা সড়কপথ, সেতু, রেলপথ, নৌপথ এবং আকাশপথে সমন্বিত বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি কার্যকর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। সড়ক নিরাপত্তা জোরদার, যানজট নিরসন এবং সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকা শহরে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) চালুর পরিকল্পনা মোতাবেক বাস্তবায়ন এগিয়ে চলেছে। গত ১৩ বছরে সড়কপথের উন্নয়নে ৩৫৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ৪৪৮টি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। একই সময় ১৭৩.২০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক ৪ বা তার অধিক লেনে উন্নীত করা হয়েছে এবং ৯১৪.৮৪ কিলোমিটার মহাসড়ক ৪ বা ততোধিক লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এবং গাজীপুর-টাঙ্গাইল ছয় লেন সড়ক নির্মাণ শেষে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ সমাপ্তির পথে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় ২৬টি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।’

ঢাকা মহানগরীতে মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট মন্ত্রী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা মহানগরী এবং সংযুক্ত এলাকার যানজট নিরসন ও গণচলাচল পরিবেশ উন্নয়নে ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় ১২৯.৯০১ কিলোমিটার (৬৮.৭২৯ কিলোমিটার উড়াল ও ৬১.১৭২ কিলোমিটার পাতাল) দীর্ঘ ও ১০৫টি স্টেশন (৫২টি উড়াল এবং ৫৩টি পাতাল) বিশিষ্ট একটি সমন্বিত মেট্রোরেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১০ কিমি দীর্ঘ ও ১৬টি স্টেশনের প্রথম উড়াল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এমআরটি লাইন ৫-এর সাউদার্ন ও নর্দার্ন রুট এবং এমআরটি লাইন-১-এর ডিটেইলড ডিজাইনের কাজ শেষের পথে রয়েছে। আশা করছি, এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণকাজ আগামী অর্থবছরে শুরু করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া সরকার চট্টগ্রাম শহরেও এমআরটি ব্যবস্থা চালুর জন্য পরিকল্পনা করছে।’

রেলপথ খাতে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা : আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান,   বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩০ বছর মেয়াদি (২০১৬-৪৫) সংশোধিত মহাপরিকল্পনা অনুসারে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে কক্সবাজার, মোংলা বন্দর, টুঙ্গিপাড়া, বরিশাল, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য এলাকা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে ও আঞ্চলিক রেলওয়ে যোগাযোগ স্থাপন এবং উন্নত কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালুর মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর সঙ্গে নিকটবর্তী শহরতলির যোগাযোগ স্থাপনের জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় ছয় ধাপে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

বাণিজ্য সহায়ক নৌপথ ও বন্দর উন্নয়ন : চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর সম্প্রসারণ ও এটিকে বিশ্বমানে উন্নীতকরণের জন্য পতেঙ্গা-হালিশহর উপকূলে বে-টার্মিনালের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম ২.৬ দিন হতে কমে ২৪-৩৬ ঘণ্টায় উন্নীত হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৬ মিটার ড্রাফট এবং ৮,০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ গ্রহণের লক্ষ্যে মাতারবাড়ীতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ যন্ত্রপাতি বহনকারী বৃহৎ জাহাজ ভিড়তে শুরু করেছে। মোংলা বন্দর চ্যানেলকে সচল রাখার এবং ১০.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজসমূহের উপযোগী করার লক্ষ্যে ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বর্তমানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই কাজ চলছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার লক্ষ্যে রানওয়ে সম্প্রসারণ ও নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করে সেখানে একটি আঞ্চলিক হাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে। তা ছাড়া দেশের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো, রানওয়ে, ট্যাক্সি ওয়ে, হ্যাঙ্গার ও আমদানি-রপ্তানি পণ্য সংরক্ষণের শেডসমূহ সংস্কার ও উন্নয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা গত ১০ বছরে বেশ পরিবর্তন হয়েছে। তা ছাড়া বেশ কটি বড় প্রকল্পের কাজ এখন চলমান রয়েছে। এখন যোগাযোগের বরাদ্দের সময় শুধু প্রকল্প বাড়ানোর বরাদ্দ দিলে হবে না, সেই সঙ্গে যে কাজগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে সেগুলো যেন ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্যও বরাদ্দ থাকে সে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। তাহলে দেশ যোগাযোগ খাতের বরাদ্দের সুফল পাবে।’