সামাজিক সুরক্ষায় বাড়ছে শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় সামাজিক সুরক্ষা খাতে শুধু প্রতিবন্ধীদের ভাতা ১০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তা ছাড়া দারিদ্র্য নিরসন, নারী উন্নয়ন ও শিশুকল্যাণ, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজে চলতি অর্থবছরে যা বিদ্যমান আছে আগামী অর্থবছরের জন্যও তা থাকবে। তবে বৈশি্বক মূল্যস্ফীতির কথা চিন্তা করে এরই মধ্যে চালু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিও নতুন অর্থবছরে অব্যাহত থাকবে।

আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বরাদ্দ করা এ অর্থ বাজেটের ১৬.৭৫ শতাংশ এবং জিডিপির ২.৫৫ শতাংশ।

সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম : অর্থমন্ত্রী তার বাজেট প্রস্তাবনায় বলেন, উন্নয়ন জোরদার করার লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, যার সেøাগান হচ্ছে, ‘সবার সঙ্গে সমৃদ্ধির পথে’। এরই মধ্যে ২৯ শতাংশ পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে এবং বাজেট বরাদ্দ ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দারিদ্র্য নিরসনমূলক কার্যক্রম : শহর এলাকায় ‘শহর সমাজসেবা কার্যক্রম’ এবং ‘অ্যাসিডদগ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কার্যক্রম’ নামে ৪টি সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে জনপ্রতি ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রদান ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

দুস্থ, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য গৃহীত কার্যক্রম : মোস্তফা কামাল বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ৫৭ লাখ ১ হাজার ভাতাভোগীর জন্য বয়স্ক ভাতা খাতে ৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা চলমান থাকবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০ লাখ ৮ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মাসিক ৭৫০ টাকা হারে ভাতা দেওয়া হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যা আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫৭ হাজার বৃদ্ধি করে ২০ লাখ ৮০ হাজারের স্থলে ২৩ লাভ ৬৫ হাজার উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ সময় মাসিক ভাতার হার ৭৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি করে ৮৫০ টাকা করা হবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ভাতা বাবদ ২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নারী উন্নয়ন ও শিশুকল্যাণে উদ্যোগ : এতিম শিশুদের খোরাকি ভাতা জানুয়ারি, ২০২২ থেকে ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করে মাসিক জনপ্রতি ৪০০০ টাকা হারে দেওয়া হয়েছে। শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রসমূহের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত বিপন্ন শিশুদের সেবা দিয়ে পরিবার বা নিকট আত্মীয় বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে পুনঃএকত্রীকরণ/পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হচ্ছে। বর্তমানে কেন্দ্রসমূহে ২,২৯১ জন (১,০৮৮ জন ছেলে এবং ১,২০৩ জন মেয়ে) শিশু অবস্থান করছে।

মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি : গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র গর্ভবতী মায়ের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরের উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৪৫ হাজার। চলতি বছরের এ সংখ্যা থেকে ২ লাখ ৯ হাজার বৃদ্ধি করে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৫৪ হাজারে উন্নীত করার প্রস্তাব করছি। এ খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে সব শ্রেণির বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা ন্যূনতম ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা আগের অর্থবছরের সমপরিমাণই বিদ্যমান থাকবে।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন : অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশব্যাপী ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। স্কুলগামী বেদে, অনগ্রসর ও তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চারস্তরে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন : অর্থমন্ত্রী বলেন, কভিড-১৯ অতিমারীর অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার আওতা বৃদ্ধি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১২টি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫০টিসহ ২৬২টি উপজেলায় ভাতাপ্রাপ্তির যোগ্য শতভাগ বয়স্ক ও বিধবাকে ভাতা প্রদান কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির চলমান কার্যক্রম বেগবান করা হয়েছে। উপকারভোগী পরিবারের প্রত্যেককে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দুই ধাপে ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি : বিশ^ব্যাপী মূল্যস্ফীতির প্রভাবের কথা ভেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশব্যাপী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় এক কোটি পরিবারের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এক কোটি পরিবার টিসিবির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সহায়তা পাচ্ছে। সরকারি এ উদ্যোগের ফলে দেশের প্রায় পাঁচ কোটি স্বল্প আয়ের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।