‘কভিডের বিপর্যয় জয় করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা’স্লোগান সামনে রেখে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। এবার সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৩৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ৫১তম এই বাজেট নিয়ে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের নেতৃত্বে থাকা শিল্পীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
তবে বিষয়টিকে সেভাবে দেখছেন না দেশের বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র অভিনেতা সোহেল রানা। তিনি এই বাজেটকে বলছেন যুদ্ধকালীন বাজেট।
তার ভাষায়, ‘যুদ্ধ শুধু নিজ দেশে হতে হবে বা অস্ত্র দিয়ে হতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। আমরা মহামারী করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছি। এটা কোনো মহাযুদ্ধের চেয়ে কম কিছু নয়। আর আপেক্ষিক অর্থেই এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। যাদের কাছে মানুষের জীবনযাত্রার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য আমরা সবাই বাঁধা। একটি খাদ্য, অন্যটি ফুয়েল। এ দুটি কারণে এখন বিশ্বে সবকিছুর মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন সময়ে আমাদের দেশের দ্রব্যের দাম অনেক বেড়েছে। মানুষ ঠিকমতো দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করছে। যদিও সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সব স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে। এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই।
এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি বলবযুদ্ধকালীন বাজেট হিসেবে আমি এবারের বাজেটে তুষ্ট। গত দুই বছর আমরা করোনা মহামারীর মধ্য দিয়ে গেছি। এখন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য বেশি যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আমাদের জীবনের অন্য কিছুর আগে খাদ্য, বস্ত্র ও ভালো চিকিৎসা বেশি প্রয়োজন। এসব কিছুর দাম যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কভিড যুদ্ধের পর এখন আবার রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ। স্বাভাবিকভাবেই আমরা একটা অর্থনৈতিক যুদ্ধের মধ্যে পড়ে গেছি। শুধু সরকার নয়, সবাই মিলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য কাজ করে যেতে হবে। প্রয়োজন হলে সরকারকে কিছু বিষয়ে ভর্তুকি দিয়ে সবকিছুর দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সবাই যেন খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে। অনেক কিছুর মধ্যে সরকারকে কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়ে জনমানুষের জন্য বাজেট দিতে হবে। এবার সংস্কৃতির উন্নয়নে বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা যেন সঠিক জায়গায় ব্যবহার হয় সেটি আশা করছি। তারপরও যারা শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিষয়টি নিয়ে পড়ে আছেন আমি তাদের জ্ঞানী বলতে পারছি না। আগে মানুষের জীবন। ক্ষুধা দুই প্রকার, প্রথমত ভাতের ক্ষুধা, তারপর মানসিক বা বিনোদনের ক্ষুধা। আমরা আগে ভাতের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য যে সংগ্রাম, সেটিতে জয়ী হতে পারলে পরে না হয় মানসিক ক্ষুধার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাবে। এখন যে পরিস্থিতি তাতে নাচ, গান, নাটক, সিনেমার চেয়ে জরুরি দেশটিকে সচল রাখা, যাতে সবাই জীবনটা নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত হতে পারে। আমাদের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো না হয়।
তবে আমি সব মিলিয়ে এবারের বাজেট নিয়ে খুশি হতে পারিনি। এর পেছনে একটি মাত্র কারণ! কালো টাকাকে সাদা করার যে প্রক্রিয়া বাজেটে উত্থাপন করা হয়েছে সেটি অপরাধমূলক। যারা অন্যায়ের মাধ্যমে কালো টাকার পাহাড় গড়েছে তাদের এভাবে উৎসাহিত করার কি যুক্তি আছে আমি জানি না। তাদের অপরাধের শাস্তি তো দূরের কথা, তাদের সাধারণ জনগণের চেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আমরা সাধারণ জনগণই তো ২৫ শতাংশ কর দিয়ে থাকি। আর কালো টাকার অপরাধীরা মাত্র ৭ শতাংশ কর দিলেই নাকি সেসব টাকা বৈধ হয়ে যাবে! এটা কী ধরনের সিদ্ধান্ত আমি জানি না। এতে সাধারণ জনগণ কি তাদের কর দিতে উৎসাহী হবে? আমার ধারণা ছিল, কালো টাকা সাদা করতে গেলে তাদের ২৫ শতাংশ কর তো দিতেই হবে, সেই সঙ্গে শাস্তি স্বরূপ আরও অন্তত ১০ শতাংশ জরিমানা করা হবে। কিন্তু এবারের বাজেটে যা বলা হয়েছে, তাতে আমি যারপরনাই হতাশ। সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছে সরকারের একটি কথা। এই বিষয়ে নাকি কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো রকমের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এই কথার মাধ্যমে কালো টাকার মালিকদের অবাধ স্বাধীনতা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে মনে করি। এই একটি বিষয় ছাড়া আমি এবারের বাজেট নিয়ে বেশ খুশি।’