প্রতি বছর বাজেটের আকার যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে বাজেটের ঘাটতিও। বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেয় সরকার। বিপুল এ ঋণের পেছনে সুদবাবদও ব্যয় হয় মোটা অঙ্কের টাকা। বকেয়া ও নতুন ঋণ মিলিয়ে প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে দেনা বাড়ছে সরকারের। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছর শেষেই সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। আগামী দুই বছর পর এ ঋণের পরিমাণ ২১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় সুদব্যয়ের চাপ কিছুটা কমাতে সরকার ব্যয়বহুল অভ্যন্তরীণ ঋণ কমিয়ে তুলনামূলক কম সুদের বিদেশি ঋণে ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পনা করছে।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকার যে ঋণ নিয়েছে সেখানে অভ্যন্তরীণ উৎসের পরিমাণ হচ্ছে ৬৩ শতাংশ। বাকি ৩৭ শতাংশ নেওয়া হয়েছে বিদেশি উৎস থেকে। তবে আগামী তিন বছর বাজেট ঘাটতি মেটাতে যে ঋণ নেওয়া হবে তার ৪৫ শতাংশ বিদেশি উৎস থেকে নেওয়ার প্রাক্কলন করেছে সরকার। বিদেশি উৎসের ঋণে নিম্ন সুদহার, দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড ও দীর্ঘ পরিশোধকালসহ নমনীয় শর্ত থাকায় সরকার আগ্রহী হচ্ছে। তবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী বিদেশি ঋণের সুদহারও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে বিদেশি মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বাড়বে, যা দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব ফেলবে।
ধারাবাহিকভাবে ঋণের বোঝা বাড়লেও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় এখনো সহনীয় অবস্থায় রয়েছে ঋণ পরিস্থিতি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের পরিবর্তে ২০১৫-১৬ অর্থবছরকে ভিত্তি হিসেবে ধরায় ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মোট জিডিপির আকার ৫ লাখ ২০ হাজার ৪২২ কোটি টাকা বেড়ে ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এতে করে জিডিপির বিপরীতে সরকারের ঋণ স্থিতি নেমে এসেছে ৩৪ শতাংশ, যা মূল বাজেটে ছিল ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, করোনা অতিমারীর প্রভাব থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করে বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী তিন বছরে উচ্চপ্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাবে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ হবে। ফলে আগামী তিন বছর বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণের পরিমাণও বাড়বে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণগ্রহণের প্রাক্কলন করেছে। ফলে ওই সময়ে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আগামী তিন বছর পর সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২১ লাখ ৩৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ।
গত ১১ বছরে সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২৬৪ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারের ঋণ ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে সরকারের ঋণগ্রহণের পরিমাণ বাড়ছে। সে বছরই সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নেয়, যা এর আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি। এরপর ধারাবাহিকভাবে তা বাড়তে শুরু করে।
এদিকে বছর বছর ঋণ বাড়ায় সরকারের সুদব্যয়ের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয় ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৭১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সুদব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। এখন ঋণের সুদ পরিশোধই বাজেটে সর্বোচ্চ ব্যয়।
মূলত ট্রেজারি বন্ড ও বিল বিক্রির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করে থাকে। পাশাপাশি সরকারের দৈনন্দিন নগদ চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়ে থাকে। এর বাইরে ব্যাংকবহির্ভূত উৎসের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ নিয়ে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধনী বাজেট অনুযায়ী, সরকারের মোট ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৮ লাখ ৫০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ সময় পর্যন্ত বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৫ লাখ ৬০০ কোটি টাকা। তবে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহার বেশি হওয়ায় সরকার আগামীতে বিদেশি উৎস থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
আগামী বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ঋণ-জিডিপির অনুপাত ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। রাজস্ব সংগ্রহের ধারাবাহিক নিম্নহার সরকারে ফিসক্যাল স্পেস সংকুচিত করে চলেছে। অথচ উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে সারা দেশে ব্যাপক ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ভারসাম্য বজায় রেখে ঋণগ্রহণের মাধ্যমে মধ্যমেয়াদি বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের কৌশল অনুসরণ করছে। তবে বৈদেশিক ঋণের সুদহার কম হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে বিদেশি উৎস থেকে মোট অর্থায়নের পরিমাণ ৪৫ শতাংশ সংগ্রহ করার প্রাক্কলন করা হয়েছে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে ৯ দশমিক ২ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করে, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদে সার্বিক সুদের হার ৬ শতাংশের নিচে থাকবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস বিশেষ করে ব্যয়বহুল সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণগ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনা হবে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ সুদহার আগামীতে কমার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের জন্য বিদেশি ঋণের সুদহার উল্টো বাড়ছে। বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই স্বল্প সুদের নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুবিধা পেয়ে আসছিল। তবে ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ায় বাংলাদেশ আগের চেয়ে বেশি সুদহার ও অন্যান্য শর্ত নমনীয় ঋণের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও বিদেশি ঋণ নিচ্ছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে সরকারের বিদেশি ঋণের সুদহার কিছুটা কম। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের গড় অন্তর্নিহিত সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের গড় সুদহার ১ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ফলে আগামীতে বিদেশি ঋণগ্রহণের পরিমাণ যেমন বাড়বে তেমনি বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে। আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদবাবদ ৭৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ সময় বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
বর্তমানে সরকারের বিদেশি ঋণের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ হচ্ছে বিশ^ব্যাংক থেকে নেওয়া। এছাড়া মোট ঋণের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২৩ শতাংশ ও জাপান সরকারের ১৯ শতাংশ রয়েছে।