শোয়ার ঘরের বিছানায় পড়ে থাকা ৭৯ বছর বয়সী আশিক এলাহীর মরদেহ পচেগলে তেল জাতীয় তরল পদার্থ বিছানা থেকে গড়িয়ে পাশের কক্ষ পর্যন্ত গিয়েছিল। ভনভন করছিল মাছি, কিলবিল করছিল পোকামাকড়। তীব্র উৎকট গন্ধ কক্ষটি ছাড়িয়ে বাইরের বাতাসেও মিশেছিল। তারপরও একই ফ্ল্যাটের পাশের কক্ষে থাকা আশিক এলাহীর একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ এলাহী কিছুই টের পাননি। শুধু তাই নয়, একই ভবনের ষষ্ঠ তলার বাসিন্দা বড় মেয়ে নিশরাত সুলতানাও কোনো খোঁজ নেননি বয়োবৃদ্ধ বাবার। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল থানা এলাকার বাগান টাওয়ার নামে একটি বহুতল আবাসিক ভবনের ১০ তলার নিজের ফ্ল্যাটের বিছানায় পড়ে থাকা আশিক এলাহীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
আশিক এলাহীর মরদেহ উদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়া হাতিরঝিল থানার এসআই ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন আশিক এলাহী। তিনি খাদ্য পরিদর্শক পদে চাকরিতে ঢুকে পদোন্নতির পর বিভিন্ন জেলায় চাকরি করেন। বছর আটেক আগে অবসরে যান। তারপর থেকে হাতিরঝিলের ওই বাসাতেই ছিলেন। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন আশিক এলাহী। কিন্তু কবে কীভাবে তিনি মারা গেছেন তার কিছুই বলতে পারেননি ছেলে-মেয়েরা।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, আশিক এলাহী ও তার ছেলে ইমতিয়াজ এলাহী বাগান টাওয়ারের ১০তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ইমতিয়াজ এলাহী মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানানো হয়েছে। তবে তিনি ফরমায়েশ দিয়ে বাইরে থেকে নিজের খাবার নিজেই এনে খেতেন। অথচ পাশাপাশি কক্ষে থেকেও বাবাকে একনজর দেখতে যাননি। এমনকি একই ভবনের ষষ্ঠ তলার বাসিন্দা মেয়ে নিশরাত সুলতানাও বাবার কোনো খোঁজ নেননি। আশিক এলাহীর স্ত্রী মোছা. নাজমুল লায়লা ছিলেন কোনো এক স্বজনের বাসায়। অন্তত ৫ থেকে ৭ দিন আগে আশিক এলাহীর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার মৃত্যুর কারণ জানার জন্য মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। যদিও আশিক এলাহীর মেয়েরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই বাবার লাশ দাফনের অনুমতি চেয়েছিল, কিন্তু দেওয়া হয়নি।
এসআই ওমর ফারুক আক্ষেপ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে বাবা মরে পচে ৫ থেকে ৭ দিন বিছানায় পড়েছিল, কেউই কোনো খোঁজ নেয়নি। সেই সন্তানেরাই আবার ময়নাতদন্ত ছাড়াই তার লাশ দাফন করতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি রহস্যজনক মনে হওয়ায় ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এখন রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে যে কোনো বিষক্রিয়া কিংবা ফুড পয়জনিং বা অন্যকোনো কারণে মারা গেছেন কি না। প্রাথমিকভাবে অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে, ময়নাতদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে মামলার ধারা পাল্টে যেতে পারে।’
পুলিশ জানায়, উৎকট গন্ধ সহ্য করতে না পেরে বাগান টাওয়ারের বাসিন্দারা গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে পুলিশকে খবর দেয়। পরে হাতিরঝিল থানা পুলিশের একটি দল মালিবাগ বাগানবাড়ি এলাকার ৫০৩/৬ নম্বর হোল্ডিং নম্বরের বাগান টাওয়ারের ১০ তলার ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে আশিক এলাহীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। আশিক এলাহীর বাড়ি ফেনীর পরশুরাম উপজেলায়। স্ত্রী ছাড়াও তার তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। আশিক এলাহীর মরদেহ উদ্ধারের পর তার কোনো স্বজন ঢামেক মর্গেও যায়নি বলে জানা গেছে।