বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ফাঁকি

গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তাসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাই হলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। এটা এমন একটি নিরাপত্তা বেড়াজাল যার মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। আমাদের জাতীয় সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের কথা বলা হয়েছে। কাগজে-কলমে এ খাতে প্রতি বছর বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ আরও কমে যায়। এ বছরের বাজেটেও তা ঘটেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাজেটের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও জিডিপির ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে ৫ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। কিন্তু এর মধ্যে শুধু পেনশনের বরাদ্দ বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাই বাস্তবে এ খাতে বরাদ্দ কমেছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এক কথায়, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য প্রস্তাবিত সামগ্রিক বরাদ্দ ২ শতাংশ বেড়েছে, সে তুলনায় পেনশনভোগীদের জন্য বরাদ্দ বেড়েছে ২১.৪৮ শতাংশ।

নতুন অর্থবছরে, এমনকি ৫৭ লাখ বয়স্ক এবং বিধবা যারা বর্তমানে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা ভাতা পাচ্ছেন তাদের ভাতার পরিমাণও বাড়ছে না। সাত বছর আগে নির্ধারিত এই ভাতায় যেসব পণ্য কেনা যেত, এখন তার দাম হবে অন্তত ৬৯১ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিবন্ধীদের ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হলেও অন্য কোনো ভাতা বাড়ানো হয়নি। একই সঙ্গে ৩ লাখ ৬৫ হাজার নতুন প্রতিবন্ধীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২.০৯ লাখ উপকারভোগী যুক্ত করা হয়েছে। বাজেটের অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ কমেছে, তা ২.৭ শতাংশ থেকে ২.৩ শতাংশে নেমেছে। এই বরাদ্দ কমার বিষয়টা কল্যাণমূলক অবস্থান থেকে সরকারের সরে আসার শামিল। প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির খাদ্যের ৫০ শতাংশই চাল। ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যে যায়। মূল্যস্ফীতি দেখা দিলে মানুষ খাদ্যে কাটছাঁট করে। ফলে পুষ্টি গ্রহণ কমে যাবে এ শ্রেণির। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদার আলোকে হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় যেখানে দ্বিগুণ করা দরকার, সেখানে বরাদ্দ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এই টাকায় সামাজিক সুরক্ষা কতটা দেওয়া সম্ভব সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এমনিতেই আমাদের দেশে সবাই ভাতা পায় না। বয়স্ক ভাতার কথাই ধরা যাক। এই ভাতাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে পুরুষের বয়স সর্বনিম্ন ৬৫ বছর ও নারীদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৬২ বছর হতে হবে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠী সব মিলিয়ে ৭ শতাংশ। দেশে মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরলেও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২০ লাখের মতো। আর ভাতার পরিমাণ নিয়ে সমালোচনা তো আছেই। গত ৭ বছর ধরে তারা মাত্র ৫০০ টাকা করে ভাতা পেয়ে আসছেন। ভাতার টাকা বাড়েনি। অথচ আজ থেকে ৫ বছর আগে ৫০০ টাকা দিয়ে একজন বয়স্ক দরিদ্র ব্যক্তি যতটুকু খাবার ও ওষুধ কিনতে পারতেন এখন সেটা পারেন না। কেননা মূল্যস্ফীতির কারণে ওষুধের দামও বেড়েছে প্রতি বছর। তার মানে, প্রকৃত অর্থে ভাতার পরিমাণ কমে গেছে।

মানুষের বয়স হয়ে গেলে প্রতিবাদ করার শক্তি হারিয়ে যায়। অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকতে হয়। সরকার দয়ার পরিমাণটাও ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে! কয়েকদিন আগে এক দৈনিকে এরকম ভাতাভোগী এক হতদরিদ্র বৃদ্ধের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। তার বাড়ি রাজশাহী। ৩ বছর আগেও উনি ৫০০ টাকা দিয়ে দুটো ইনহেলার কিনতে পারতেন। এখন আর পারেন না। তাছাড়া শরীরে এখন আরও নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। তিনি বলেছেন, জীবন এখন তার কাছে বোঝা হয়ে গেছে। একমাত্র মৃত্যুই তার মুক্তি এনে দিতে পারে! এমন মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সরকার এমন মানুষদের প্রতি সহায়তার হাত ক্রমেই গুটিয়ে নিচ্ছে। এটা দুঃখজনক।

সামাজিক নিরাপত্তায় কম বরাদ্দের লজ্জা থেকে বাঁচতে অথবা বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা থেকে সরকার প্রতি বছর এ খাতে অতিরঞ্জন করে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে এমন কিছু খাত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আসলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যে বৃত্তি দেওয়া হয়, সেটাকেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বলছে সরকার। আবার অবসরভোগী সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ, করোনার কারণে ব্যাংকের সুদ মওকুফ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সুদ ভর্তুকিকেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই চার বিষয়ে আগামী অর্থবছরে থাকছে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকার ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র (এনএসএসএস) করলেও অনেক ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে চলমান সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সংগতিপূর্ণ নয়। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ২০১৬ সালেই তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জানিয়েছিল যে দেশের ৬৪ শতাংশ দরিদ্র মানুষ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলোর একটির সুবিধাও পায় না। বরাদ্দ কম, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সহায়তা পাওয়ার যোগ্যদের সবাই সহায়তা না পাওয়া হচ্ছে অন্যতম তিন সমস্যা।

এ ব্যাপারে করণীয় হচ্ছে : ১. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগী বাছাই পদ্ধতি, বাছাই সভার সভাস্থল ও সময়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নির্বাচিত উপকাভোগীদের সব রকম তালিকা সম্পর্কিত সব তথ্য উন্মুক্ত করা এবং তা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অবহিত করা। ২. বিদ্যমান নীতিমালায় স্থানীয় পর্যায়ের উপকারভোগী বাছাই কমিটিতে (ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে) উপকারভোগীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মরত বেসরকারি সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ৩. বয়স্ক ভাতার উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বয়সের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্রকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে অসংখ্য ব্যক্তির ভুল বয়স লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যার সংশোধন প্রক্রিয়া দরিদ্র ও বয়স্ক ব্যক্তির জন্য ব্যয়বহুল ও কঠিনতর। বয়সের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে শুধু এনআইডিকে বিবেচ্য না ধরে ব্যক্তির অন্যান্য দলিল বা তথ্যকেও বিবেচনায় নেওয়া এবং একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ ও সুলভ করা। ৪. নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সেবার জনপ্রতি ভাতার (টাকার) পরিমাণ এমনভাবে বাড়ানো যা দরিদ্র উপকারভোগীদের জীবন ধারণের ন্যূনতম ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট হয়। ৫. অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর ডাটাবেজ প্রস্তুত করা ও তা নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং সেই ডাটাবেজের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্ভাব্য উপকারভোগীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা। ৬. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সব স্তরের দুর্নীতি রোধে সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা, কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এ কাজে স্থানীয় নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা। ৭. সনাতনী পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার বিষয়টি এখনো খুব একটা এগোয়নি। এ জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় এটা বাস্তবায়নের জন্য সরকার যদি একটি স্বাধীন দপ্তর গঠন করে। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে এখনো স্থবিরতা চলছে। ফলে অতিদরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবন ও জীবিকা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীকে সুসংহত করে তার দ্বারা অতিদরিদ্র মানুষের জীবনকে সুরক্ষিত করা এই মুহূর্তে জরুরি কাজ।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com