হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের আগুন পানিতেই নেভে

সীতাকুন্ডের অগ্নিকান্ডের পর বলা হলো, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো রাসায়নিক আছে জানলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা পানি না দিয়ে ফোম দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতেন। পানি দেওয়ার কারণেই নাকি আগুন আরও ছড়িয়ে পড়েছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই এমন কথা বলেছেন এবং সংবাদ মাধ্যমেও তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কারণ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের সেফটি কোডে লেখাই থাকে যে, কখনো আগুন লাগলে এটা পানি দিয়েই নেভাতে হবে, অন্য কিছু নয়। এটাই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত গাইডলাইন।

আমাদের বুঝতে হবে যে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের হান্ড্রেড পার্সেন্ট কনসেনট্রেশন কখনো ব্যবহার করা হয় না। এসিডের মতো এটা পানি দিয়ে মিশিয়েই ব্যবহার করা হয়। আমরা কিন্তু অনেকভাবেই হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহার করি। আপনি ওষুধের দোকান থেকে মাউথ ওয়াশ কিনবেন, সেটা দিয়ে কুলি করবেন জীবাণুনাশক হিসেবে। সেটাতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থাকে। আমাদের টুথপেস্টে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থাকে। দাঁত লালচে হয়ে গেলে দাগ লেগে গেলে এর ব্যবহারে দাঁত সাদা হয়। এসব ক্ষেত্রে ১-২ শতাংশের মিশ্রণই যথেষ্ট। এমন নানা কাজে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের নানা মাত্রার কনসেনট্রেশন ব্যবহার করা হয়।

এখন মনে রাখতে হবে যে, এটার বিভিন্ন মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে রিঅ্যাক্ট করে। ১০ শতাংশের বেশি কনসেনট্রেশন থাকলে সেটা এক রকম, ৩০ শতাংশের বেশি হলে সেটা আরেকরকম। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড যদি ৬০ শতাংশের বেশি কনসেনট্রেশন থাকে তাহলে সেটা হয়ে যায় উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক ক্ষমতাসম্পন্ন। সীতাকুন্ডের কনটেইনার ডিপোতে যে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছিল সেগুলো ৬০ শতাংশ কনসেনট্রেশনের। অর্থাৎ উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক ক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু এমন হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডেও যখন পানি দেওয়া হয় তখন সেটার  সলিবিলিটি কমে যায় বা এটা নন-রিঅ্যাকটিভ হয়ে যায়। আপনি এমন ক্ষেত্রে যত বেশি পানি  দেবেন এটা তত নন-রিঅ্যাকটিভ হয়ে যাবে বা এর বিস্ফোরক সক্ষমতা নষ্ট হবে।

হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কনটেইনারে রাখার তিনটি আবশ্যিক শর্ত আছে। ইট শুড বি কুল, ইট শুড বি ড্রাই, ইট শুড বি ভেন্টিলেটেড। অর্থাৎ এটা ঠান্ডা রাখতে হবে, শুকনো রাখতে হবে এবং বাতাসের প্রবাহ থাকতে হবে। ৬০ শতাংশের বেশি কনসেনট্রেশনে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কখনোই বদ্ধ জায়গায় রাখা যাবে না। কিন্তু সীতাকুন্ডে এগুলো বদ্ধ কনটেইনারে রাখা ছিল। আমরা জেনেছি, ডিপোতে রাত ৯টার দিকে একটা আগুন লেগেছিল। সেটা কীভাবে তা আমরা জানি না। আগুন লাগার পর তার উত্তাপে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাখা কনটেইনারগুলো ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কারণ কনটেইনারগুলো মেটালিক। এটাই ছিল মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ আগুন লাগলে তার রেডিয়েশন হরাইজন্টালি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এভাবে উত্তাপ বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে রাত ১১টায় ওই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। এখন শুরুর দিকে যে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা পানি ছিটিয়ে সেসব ঠান্ডা করার চেষ্টা করেছিলেন তারা যথাযথ কাজটিই করেছিলেন।

লেখক: অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট 

বিস্তারিত সাক্ষাৎকার পড়ুন চিন্তা পাতায়, পৃষ্ঠা-৪ এ