আ.লীগ নেতা টিপু হত্যা

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে মুসার মুখে অনেক প্রভাবশালীর নাম

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে সুমন শিকদার ওরফে মুসা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বলেছেন, যারা সবাই মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও কলেজছাত্রী আফনান প্রীতি হত্যাকাণ্ডে জড়িত। ছয় দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনেই গতকাল শুক্রবার ডিবি হেফাজতে থাকা মুসা আলোচিত এই জোড়া খুনে সংশ্লিষ্ট থাকার কথা স্বীকার করে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের নাম বলেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া টিপু হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির মতিঝিল বিভাগের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তারা জানান, মুসা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ১৫ দিনের জন্য গত ৮ মে দুবাই থেকে ওমান গিয়েছিলেন। দেশটির সালালা শহরে অনেক ইসলামিক ব্যক্তিত্বের মাজার জিয়ারত করে দুবাই ফিরে ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা ছিল তার। তবে দুই দিন পরই তিনি বুঝতে পারছিলেন যে কিছু অজ্ঞাতপরিচয় লোক তাকে অনুসরণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই সফর সংক্ষিপ্ত করেন। তবে তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১২ মে ওমান ও আবুধাবি সীমান্ত থেকে মুসাকে গ্রেপ্তার করে ওমান পুলিশ।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে অনেক রাঘববোয়ালের নাম উঠে আসছে মুসার জবানিতে। সেসব নাম যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানান, সুমন শিকদার ওরফে মুসা ঢাকার অপরাধ জগতের একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রকাশ-বিকাশের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে মতিঝিল এলাকার আরেক সন্ত্রাসী ফ্রিডম মানিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। দুবাইয়ে অবস্থানরত আরেক পলাতক সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। দুবাই গিয়ে জিসানের আশ্রয়েই থাকার পরিকল্পনা ছিল মুসার। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর মতিঝিল, পল্লবী থানায় হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০১ সালের পাঁচটি, ২০০৩ সালের দুটি, ২০০৪ সালের তিনটি এবং ২০১৬ সালের একটি মামলা রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মিরপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকা- করে বেড়িয়েছেন মুসা। পল্লবী থানায় একাধিক মামলা হওয়ার পর ফ্রিডম মানিকের সহায়তায় মতিঝিল এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ভয়ংকর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে টিপু হত্যাকাণ্ডের ১২ দিন আগে গত ১২ মার্চ দুবাই পালিয়ে যান মুসা। কোথায়, কার কাছ থেকে অস্ত্র নেওয়া হবে, কে গুলি করবে, কীভাবে রেকি করা হবে এবং পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য সব রুট সম্পর্কে আগে থেকেই মোল্লা শামীমকে বুঝিয়ে দেন মুছা। পরে দুবাই গিয়ে ৮ মে ওমানে চলে যান। এ খবর চলে আসে টিপু হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে। এ ছাড়া মোল্লা শামীম টিপু হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে ভুটান গেছেন বলে তারা তথ্য পেয়েছেন।

এদিকে মুসাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ওমানে পাঠানো বাংলাদেশ পুলিশের দলটিতে (এস্কট) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা না থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে খোদ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ের অভ্যন্তরেই। বলা হচ্ছে, মুসার ওমানে পালিয়ে যাওয়ার তথ্যটি প্রথম পেয়েছিলেন পরিদর্শক মোহাম্মদ ইয়াসিন শিকদার।

তদন্তের সার্বিক অবস্থা ও এস্কটের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডিএমপির ডিবির প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘ছয় দিনের রিমান্ডে রয়েছেন মুসা। তার কাছ থেকে অনেক তথ্যই পাচ্ছি। তবে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্যকেই আমরা আমলে নিচ্ছি না। আর সবকিছু বিবেচনা করেই ওমানে পাঠানো এস্কটের সদস্য নির্বাচন করা হয়েছিল। মুসার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরই আমরা এস্কট পাঠানোর বিষয়ে মাসকট এনসিবি’র সহায়তা চাই আমাদের এনসিবির মাধ্যমে।’

গত ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে নিজ গাড়িতে বাসায় ফেরার সময় রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম শাহজাহানপুর আমতলা এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করা হয় জাহিদুল ইসলাম টিপুকে। এ সময় পাশেই যানজটে আটকে থাকা রিকশা আরোহী কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতিও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আলোচিত এই জোড়া খুনের ঘটনার দুই দিনের মাথায় ডিবির একটি দল শ্যুটার আকাশ মোহাম্মদ মাসুমকে গ্রেপ্তার করে। হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন মাসুম। তার স্বীকারোক্তিতে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় আরফান, শামীম, মানিক ও মুসার নাম ওঠে আসে। মানিকও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরই মধ্যে আলোচিত এই জোড়া খুনের ঘটনায় মুসাসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।