মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শমসেরনগর ও মনু রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী চককবিরাজি এলাকায় চলন্ত অবস্থায় ট্রেনটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে কমলগঞ্জসহ ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এরইমধ্যে পুড়ে যায় তিনটি বগি। আগুনে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে পারাবত এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনায় ঢাকা-সিলেট রেলপথে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ট্রেনটির পাওয়ার কারের জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চলন্ত ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল হককে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পারাবত এক্সপ্রেস ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছাড়ার পর শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করার সময় হঠাৎ পাওয়ার কার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। সামনে এগিয়ে গিয়ে যাত্রীরা আগুন দেখতে পেয়ে হইচই করে দৌড় শুরু করেন। এমন পরিস্থিতিতে চালক ট্রেন থামানোর উদ্যোগ নিলে দ্রুত লাফ দিয়ে বের হন যাত্রীরা। এ সময় ৫/৭ জন যাত্রী আহত হন। আর অক্ষত বগিগুলোকে আগুন লাগা বগি থেকে আলাদা করে কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়।
আগুন লাগার দীর্ঘ সময় পরেও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় পারাবত এক্সপ্রেসের সামনের ৮টি বগির যাত্রীরা কুলাউড়া স্টেশনে এবং পেছনের বগির যাত্রীরা নিজ নিজ খরচে সড়কপথে সিলেটসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছান।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় পতনঊষার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। ভয়ে লাফ দিতে গিয়ে কয়েকজন আহত হন। কিন্তু আগুন লাগার পরে রেলের কোনো কর্মচারী এগিয়ে আসেননি। আগুন নেভানোর কোনো যন্ত্রও ছিল না ট্রেনে।’
মৌলভীবাজার ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ হারুন পাশা জানান, যাত্রীরা আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯- এ কল করেন। খবর পেয়ে কমলগঞ্জসহ ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ট্রেনের পাওয়ার কারের জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কমলগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিফাত উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থাল পরিদর্শন করেছি। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল হককে প্রধান করে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন। আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
এদিকে ট্রেনে আগুন লাগার খবর পেয়ে রেলওয়ের বিভাগীয় কর্মকর্তা খায়রুল কবিরসহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
আন্তঃনগর পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিচালক ইসমাইল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রেনের পাওয়ার কার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ট্রেন থামানোর পর দেখা যায় চাকার মধ্যে আগুন ও পরে জেনারেটরে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।’
শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার জামাল উদ্দীন জানান, পারাবত এক্সপ্রেসে আগুন লাগার পর সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি লংলা স্টেশনে এবং চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি শ্রীমঙ্গলে আটকা পড়ে। আগুন পুরোদমে নিয়ন্ত্রণে এলে বিকেল ৫টায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এতে প্রায় ৫ হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।
আলাদা ৩ তদন্ত কমিটি : পারাবত এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনায় মোট ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ের বিভাগীয় পর্যায়ে দুটি এবং মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনে যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তা তদন্তে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা দুর্ঘটনার কারণ, ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ এবং কেউ দায়ী থাকলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবেন। প্রতিটি কমিটিতে চারজন করে সদস্য রয়েছেন। দুটি তদন্ত কমিটির একটি হলো ডিভিশনাল কমিটি, অন্যটি জোনাল কমিটি।’
পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের পরিবহন কর্মকর্তা খায়রুল কবিরকে একটি কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।