জলবায়ু অভিযোজনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার

বাংলাদেশ যেন এক দুর্যোগের দেশ, একের পর এক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগই যেন আমাদের নিয়তি। কিছুদিন আগেও দুর্বল অবকাঠামো ও ভঙ্গুর অর্থনীতির সঙ্গে ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে বন্যা ও সাইক্লোন আমাদের বিপর্যস্ত করে রাখত। তবে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্যোগে এবং জনগণের প্রচেষ্টায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। সাইক্লোন ও বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির হার কমে এসেছে, পাশাপাশি প্রাণহানিকেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে আনতে পেরেছি। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ বেড়েছে বৈ কমেনি, অনেক ক্ষেত্রে দুর্যোগের ধরন ও প্রকোপ বেড়েছে। এখনো বঙ্গোপসাগর-কেন্দ্রিক একের পর এক যেসব সাইক্লোনের উৎপত্তি হচ্ছে, হয়তো এর কোনো কোনোটি আমাদের দেশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে না, পাশের দেশে চলে যাচ্ছে এবং সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাচ্ছে, যা আপাত স্বস্তি দিলেও বলে দিচ্ছে যে আমরা যখন-তখন আক্রান্ত হতে পারি।

সাইক্লোন ও বন্যাকে তাও আমরা দেখতে পাই কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের এমন অনেক পরিবর্তন আছে, যা সহজে দেখতে পারি না যদিও নীরবে তা ঘটে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি, খরা এবং এর প্রভাবে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। আমাদের দেশে যার বড় ভুক্তভোগী বরেন্দ্র অঞ্চলসহ অন্য অঞ্চলের কৃষকরা। আজ থেকে বিশ, পঁচিশ ও একশ বছর পর বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি কী হবে, পানির অভাবে আদৌ কৃষি কাজ করা যাবে কি না সেটা যেমন একটা প্রশ্ন, একইভাবে শঙ্কা মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা কতটুকু রক্ষা করা যাবে সেটা নিয়েও। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যতই স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলি না কেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ততা অর্জনের পথ এখনো অনেক দূর। হয়তো চাল উৎপাদনে অনুকূল আবহাওয়ায় আমরা কোনো কোনো বছর লক্ষ্য অর্জন করতে পারি কিন্তু মানুষের খাদ্যাভ্যাস তো এখন আর আগের অবস্থায় নেই, ভাতের পরিবর্তে গম ও আটার ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে কয়েক গুণ। পরিসংখ্যান মতে, আমাদের দেশে গমের প্রয়োজন হয় প্রায় ৮৫ লাখ টন, এর মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ চাহিদা আমরা নিজস্ব উৎপাদন থেকে মেটাতে পারি আর বাকিটা আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গমের উৎপাদন প্রতি বছরই কমছে। এবার হাওরে আগাম বন্যার কারণে অনেক কৃষকের ধান মাঠেই নষ্ট হয়েছে। এই সবগুলোই খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নীরবে লোকচক্ষুর অন্তরালে যা ঘটে যাচ্ছে সেসব উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর মধ্যে অন্যতম সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়া। এর প্রভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কৃষি, মৎস্যসম্পদ, প্রাণিসম্পদ যেমন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, তেমনি নিরাপদ সুপেয় পানিপ্রাপ্তির বিষয়টিও একটি বড় সমস্যার বিষয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে। উপকূল অঞ্চলে লবণপানির প্রকোপ যেভাবে বাড়ছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের উপকূলের জনগণের জীবনযাপন আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

একদিকে খরা, অন্যদিকে হঠাৎ বন্যা ও উপকূলে লবণাক্ততার প্রভাব ইত্যাদি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তাকে সামগ্রিকভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন করছে, যেটা একই সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবার তাগিদ দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের সাময়িক দুর্যোগের চেয়েও দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর খরা ও উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা পৃথিবীর কাছে যদিও একটি দৃষ্টান্ত কিন্তু পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য অভিঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। এ মুহূর্তেও বড় প্রশ্ন ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক পরিবেশের যে পরিবর্তন সংগঠিত হচ্ছে তার বিপরীতে আমরা কতটুকু অভিযোজিত হতে পারছি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ও এর নেতিবাচক প্রভাবে ছেদ পড়ার কোনো সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। কারণ উন্নত ও ধনী দেশগুলো তাদের অতিরিক্ত ভোগের কারণে কার্বন ও মিথেন উৎপাদনের পরিমাণ এতটুকু কমাতে পারেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অভিযোজন কৌশলের একটা বড় অংশ হতে হবে দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধারাবাহিক নেতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ কাটিয়ে উঠতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। সেখানে আমাদের দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় কৃষির ওপর গুরুত্বারোপ ও বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। যাকে আমরা জলবায়ু সহনশীল কৃষি হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারি। আর এই কৃষি শুধু প্রযুক্তি নির্ভরশীল হলেই হবে না, হতে হবে ভুক্তভোগী মানুষের আয়ত্তে ও সাধ্যের মধ্যে, যাতে তাদের এ সম্পর্কিত সক্ষমতা বাড়ে এবং সামগ্রিক উৎপাদনব্যবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ের কৃষকদের নিয়ন্ত্রণ থাকে।

সম্প্রতি সময়ে জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, সরকার একটি অভিযোজন নীতিমালা চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন প্রক্রিয়া সফলভাবে করার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো ও খাতভিত্তিক অগ্রিম পরিকল্পনা করা দরকার তার যথেষ্ট ঘাটতি আছে এখন পর্যন্ত। কৃষি যেহেতু আমাদের অর্থনীতির প্রাণ তাই কৃষিকেন্দ্রিক আমাদের অভিযোজন পরিকল্পনা সবার আগে করা দরকার এবং কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষকে এ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা দরকার। একই সঙ্গে আমাদের সীমিত চাষযোগ্য জমির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা যাতে সংরক্ষিত হয়, সেজন্য বছরব্যাপী একটি শস্য উৎপাদনভিত্তিক ক্যালেন্ডার হালনাগাদ করা এবং এ অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

তবে অভিযোজনই শেষ কথা নয় বা সবকিছুতেই অভিযোজন সম্ভবও নয়, লবণাক্ত পানি মোকাবিলায় সহনশীল টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি হয়তো উদ্ভাবন হতে পারে কিন্তু লবণাক্ত পানি পান করা মানুষের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। তাই মানুষদের জন্য সুপেয় নিরাপদ পানীয়ের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। এখানে আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজলে চলবে না। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সার্বিক ক্ষতিসমূহ কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাসমূহ নিশ্চিত করতে হবে, যা প্রান্তিক অধিকার। তাই অভিযোজনের পরিকল্পনা যদি ভুক্তভোগীর অধিকার সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট না হয় তাহলে তা কোনোভাবেই সম্পূর্ণ না। অভিযোজনের মূল লক্ষ্য কোনো রকমে টিকে থাকা না, বরং টিকে থাকার পাশাপাশি সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক চাহিদার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং এর মাধ্যমে উন্নয়নের মহাসড়কে নিজেদের শামিল করতে পারা। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলার পাশাপাশি তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জনসেবা নিশ্চিত করা। যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে এই ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী উন্নয়নের ধারায় শামিল হতে পারে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী
psmiraz@yahoo.com