কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা তিনজনেরই নজর জামায়াতের ভোটের দিকে। বিএনপির মিত্র এই দলটির ৩৫ হাজার ভোট আছে। এ ছাড়া ৯টি ওয়ার্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন এই মেয়র প্রার্থীরা। গতকাল রবিবার কুমিল্লা শহরে সাধারণ ভোটার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন। তাদের মধ্যে দুজন ছাড়া বাকিরা স্বতন্ত্র প্রার্র্থী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত নৌকা), বর্তমান মেয়র বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মনিরুল হক সাক্কু (টেবিল ঘড়ি) ও বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সারের (ঘোড়া) মধ্যে লড়াইয়ের আভাস মিলছে। তারা বিভিন্নভাবে জামায়াতের ভোট নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছেন। তাই শহর জামাতের আমির দ্বীন মোহাম্মদ ও সেক্রেটারি জেনারেল এমদাদুল হক মামুনের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিন মেয়র প্রার্থী। কুমিল্লা সিটির বেশকিছু এলাকায় কাউন্সিলর নির্বাচন করছেন জামায়াতের নেতারা। মেয়র প্রার্থীরা ভোট আদায় করার জন্য জামাতের কাউন্সিলরদের জয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের অনুসারী কুমিল্লা কান্দিরপাড়ের বাসিন্দা মো. মাহফুজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুমিল্লায় দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতির ফলে নৌকার ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিভিন্ন দলের ভোট টানতে কাজ করা হচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে জামায়াতের ভোটও আমাদের দরকার।’
শহর ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াতের ভোট ছাড়াও সিটির মেয়র হতে গেলে ১৯ থেকে ২৭ এই ৯টি ওয়ার্ডের ভোট মেয়র প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ছাত্রলীগ নেতার এ কথার সত্যতা পাওয়া গেছে।
এই ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কোটবাড়ি, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, চৌয়ারা বাজার, রঘুপুর বাখরাবাদ, ইয়াসিন মার্কেটসহ আরও কিছু এলাকা। এসব এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট নিয়ন্ত্রণ করেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। আর কিছু অংশের ভোটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রভাব রয়েছে। এই ভোট প্রার্থীদের জয়ের জন্য নিয়ামক হয়ে উঠবে বলে দাবি করছেন সাধারণ ভোটাররা।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ভোটের নানা রকম হিসাব-নিকাশের কারণে এখনো কাউকে মেয়র হিসেবে এগিয়ে রাখতে পারছেন না ভোটাররা। তারা বলছেন, শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন তা বলা মুশকিল।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোট যেমন অন্য বাক্সে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি বিএনপির ভোটও দুই প্রার্থীর মধ্যে ভাগাভাগি হবে। এ অবস্থায় সব প্রার্থীরই টার্গেট জামায়াতের ভোটের দিকে। তাই জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করা প্রভাবশালী নেতারা। কারণ, জামায়াত নেতাদের জবানকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
কুমিল্লা শহর আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুটি ধারা। কুমিল্লা শহরের পদ-পদবিতে থাকা নেতারা ‘এ টিমের’ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ‘এ টিমের’ প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। ‘এ টিমের’ বাক্সে ‘বি টিমের’ ভোট পড়বে কি না সেটাই মূল ফ্যাক্টর। ‘বি টিমের’ ভোট পরিমাণে কম হলেও এই ভোট নৌকার জয়ের জন্য জরুরি। ‘বি টিমের’ মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন কুমিল্লা উত্তর ও দক্ষিণের প্রভাবশালী দুই নেতা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। তাদের অনুসারী হিসেবে সামনে থেকে শহরে রাজনীতি করেন প্রয়াত আফজল খানের ছেলে মাসুদ পারভেজ খান ইমরান, শহর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক আনিসুল ইসলাম মিঠু, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নুরুর রহমান তানিম, শফিকুল ইসলাম শিকদার, কবিরুল ইসলাম শিকদার। তাদের অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদুয়ার বাজার এলাকার আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বি টিমের’ ওই নেতারা প্রকাশ্যে মিটিং-মিছিল ও নৌকার পক্ষে গণসংযোগে উপস্থিত থাকলেও ভোটকেন্দ্রে তাদের অনুসারীরা নৌকায় সিল মারবেন কি না সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, ‘এ টিম’ ও ‘বি টিমের’ পুরনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেই দ্বন্দ্ব তারা কি ভুলেছে সেই আলোচনা এখন জমে উঠেছে কুমিল্লার ভোটের মাঠে।
তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাসুদ পারভেজ খান ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবাই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে নৌকার পক্ষে মাঠে নেমেছি।’
জানতে চাইলে নুরুর রহমান তানিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি তারা ঐক্যবদ্ধ হলেই হয়। আমরা যারা এক নেতা, এক কর্মী তাদের ঐক্যবদ্ধ হলেই কী, না হলেই বা কী?’ তিনি বলেন, ‘নৌকার প্রার্থীর জন্য কাজ করছি, করে যাব।’
নৌকার প্রার্থী ও কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু অংশ যারা মনোনয়ন চেয়ে পাননি তারা মন খারাপ করে বাসায় বসে আছেন। এছাড়া দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।’
জামায়াত-বিএনপির ভোট টানতে কাজ করছেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে রিফাত বলেন, ‘কুমিল্লা শহরের যারা ভোটার আমি সবার ভোট প্রত্যাশা করছি। সবার কাছে ভোট ও দোয়া চাই।’
বর্তমান মেয়র সাক্কুরও নজর ৯টি ওয়ার্ড ও শহর জামায়াতের ভোট ব্যাংকের প্রতি। তবে ৯টি ওয়ার্ডের ভোটের নিয়ন্ত্রক মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি সাক্কুর দিকেই ঝুঁকে আছেন বলে দাবি করেন সাক্কুর নির্বাচন সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা এক নেতা। ওই নেতা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, সাক্কুর পক্ষে ভোটবাক্সে বিভিন্ন দলের ভোট পড়বে। ভোটের মাঠে তেমন আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
মনিরুল হক সাক্কু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটারদের আওয়াজ কম। সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠিত হলে আমি জিতব।’
আরেক মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সারের শহরে সুনাম আছে। তার ব্যাপারে শিক্ষিত-মার্জিত এমন নানা যোগ্যতার আলোচনা সবার মুখে মুখে। কিন্তু তার নামে ১৮-১৯টি মামলা রয়েছে। ফলে মেয়র হলেও চেয়ারে বসতে পারবেন না বলে কুমিল্লা শহরে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা আছে। মেয়র নির্বাচনে সাক্কুকে হারাতেই ভোটের লড়াইয়ে নামা কায়সার শহরের মানুষের কাছে সাড়া পাওয়ার ফলে তার মধ্যেও জয়ের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
শহর ঘুরে আরও জানা গেছে, কেন্দ্র থেকে বিএনপির বহিষ্কৃত এই দুই নেতার পক্ষে দলের নেতাকর্মীকে না নামতে বলা হলেও দায়িত্বশীল নেতারা ভেতরে ভেতরে কাজ করছেন। পদ-পদবিহীন কর্মীরা সাক্কু-কায়সার ভাগ হয়ে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন।
টমসম ব্রিজ এলাকার বিএনপির সমর্থক ওয়াসিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে নানা দিক আছে। প্রার্থী সবাই যোগ্য। এখানে উন্নয়নের সম্ভাবনা ও এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার সামর্থ্য যার আছে তেমন মেয়র এলাকার মানুষের প্রত্যাশা। মেয়র সাক্কু দুই বার মেয়র ছিলেন, শহরের মানুষের তেমন ক্ষতি হয়নি। উন্নয়ন কমবেশি হয়েছে। তবে রিফাত নির্বাচিত হলে জমকালে উন্নয়ন হবে, কিন্তু শহরে একনায়কতন্ত্র কায়েমের একটা শঙ্কা রয়েছে।