আসন্ন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে বিশ্লেষকরা বলে আসছেন প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংও (সানেম) একই কথা বলছে।
সংস্থাটি বলছে, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বাজেট প্রস্তাবনায়। মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত যে সংকটের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ দিন কাটাচ্ছে, সেই সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বাজেটে নেই। পণ্য ও সেবার বাড়তি চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে সেটাও বলা হয়নি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে এই বাজেট পর্যালোচনা তুলে ধরে সানেম। সংস্থাটি জানায়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানো দরকার ছিল। কাছাকাছি সময়ে তেল ও জ্বালানির দর সমন্বয় মূল্যস্ফীতিতে চাপ ফেলতে পারে বলে মনে করে সানেম।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এ-সময় তিনি আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান। কিন্তু বর্তমানেই মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। সব ধরনের নিত্যপণ্যসহ গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়নি।
সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ছিল, সেখানে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু এ বছর পেনশন, বৃত্তি ও সুদ বাদে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত বরাদ্দ ১ শতাংশের মতো। এমনকি গত বছরের চেয়েও এবার বরাদ্দ কমানো হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাথাপিছু সামাজিক ভাতার বরাদ্দ বৃদ্ধি করা দরকার ছিল। ওপেন মার্কেট সেইল বা ওএমএসে বরাদ্দ না বাড়িয়ে উল্টো কমানো হয়েছে।’
বৈষম্য প্রসঙ্গে সায়মা হক বলেন, ‘২০১৬ সালের পর সরকারি পরিসংখ্যান নেই। সেই ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ শীর্ষ ধনীর হাতে পুঞ্জীভূত। আর কভিডকালে বৈষম্য আরও বেড়েছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান নেই। বৈষম্য কমাতে কর কাঠামো সংস্কার করতে হবে। অর্থাৎ যার যত বেশি সম্পদ, তার ওপর তত বেশি হারে করারোপ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘এ বছরের বাজেট পরবর্তী সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে যত আলোচনা হচ্ছে, বাজেটের মূল কাঠামো নিয়ে ঠিক ততটা হচ্ছে না। এটা সব দিক থেকেই অনৈতিক। সানেম এই নীতি সমর্থন করে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাকা পাচার হলো কেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার যে প্রক্রিয়া প্রস্তাব করা হয়েছে তা বাদ দেওয়া উচিত, এটি নৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্য।’
এই বাজেট বৃহৎ ব্যবসাবান্ধব উল্লেখ করে সেলিম রায়হান বলেন, ‘করপোরেট কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা বড় বড় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু গত দুই বছরে দেশের ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা যেমন পুনরুদ্ধারে খুব একটা সহায়তা পায়নি, তেমনি এই কর ছাড় তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘তথ্যের ঘাটতি সব সময়ই একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা গেছে। বিশেষ করে কভিডের সময় তা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। তখন দেশের বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলো দারিদ্র্য নিয়ে বেশ কয়েকটি জরিপ করে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সেরকম জরিপ বা গবেষণা করা হয়নি।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর জরিপ নিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, ‘সরকার বিশেষ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) দেশের অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটি সম্মেলন করতে পারে। সেখানে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জরিপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারে। অনুষ্ঠানে সানেমের গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।