সীতাকুন্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আল রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কন্টেইনারে বিস্ফোরণের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের অন্যান্য রপ্তানিকারকদের। ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ থেকে এই রপ্তানি পণ্যটি পরিবহনে অনীহা জানাচ্ছে শিপিং লাইনগুলো। ফলে বিভিন্ন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে ১০৫ কনটেইনার হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আটকা পড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)।
বিকডা সচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে জানান, বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের পর আরও চারটি ডিপোতে ১১১টি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কনটেইনার ছিল। দেশে উৎপাদিত এসব কেমিক্যাল বিভিন্ন দেশে রপ্তানির উদ্দেশে জাহাজীকরণের জন্য সেখানে পাঠানো হয়েছিল। বিএম ডিপোর ঘটনার পর ইস্টার্ন লজিস্টিক্স থেকে একটি চালান শিপমেন্ট হয়েছে। এরপর সিঙ্গাপুর বন্দরের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের নতুন চালান গ্রহণ না করার ঘোষণায় বেশ ক’টি শিপিং লাইনও বাংলাদেশ থেকে পণ্যটির চালান পরিবহনে অনীহা দেখাচ্ছে। যে কারণে অফডকগুলোতে থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কনটেইনারগুলো আর শিপমেন্ট করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, বর্তমানে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট (উত্তর), পোর্টলিংক, ইস্টার্ন লজিস্টিক্স ও কেএনটি এ চারটি ডিপোতে রপ্তানির জন্য রাখা মোট ১০৫ কনটেইনার হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আটকে আছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ) সূত্র জানায়, বিএম কনটেইনার ডিপোতে রপ্তানির জন্য হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কনটেইনারে বিস্ফোরণের ঘটনার পর এ ধরনের কেমিক্যালের চালান পরিবহনকারী আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আপাতত এ ধরনের কেমিক্যাল পরিবহন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। যে কারণে এ জাতীয় রপ্তানি পণ্যগুলো শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না।
বিএসএএ চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ দেশ রূপান্তরকে জানান, কয়েকদিন আগে সিঙ্গাপুর বন্দর নতুন করে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের চালান গ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ দিয়েছে। এ সংক্রান্ত এক নোটিসে তারা জানিয়েছে, বন্দরে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কত কনটেইনার মজুদ রাখা যাবে তার নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। তাই মজুদ নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখতে নতুন চালান গ্রহণ না করার পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এরপর ওএনই, ওওসিএল, গোল্ডস্টারসহ কয়েকটি মেইন লাইন অপারেটর (এমএলও) বাংলাদেশ থেকে এই মুহূর্তে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের রপ্তানি চালান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ছয়টি প্রতিষ্ঠান হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি করে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আল রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, এস এম কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, এইচপি কেমিক্যালস লিমিটেড, ইনফেনিয়া কেমিক্যাল ও তাসনি কেমিক্যাল কমপ্লেক্স। এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্য ভিয়েতনাম, চীন, কোরিয়া, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে।
এদিকে, জাহাজীকরণ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন ডিপোতে থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের এসব কনটেইনার রাখতে অনীহা দেখাচ্ছে ডিপো কর্র্তৃপক্ষও। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে কনটেইনারগুলো ফেরত নেওয়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছে তারা। ওওসিএল কনটেইনার ডিপোতে থাকা সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের একটি চালান ডিপো থেকে ফেরত নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছে সামুদা কেমিক্যাল কর্র্তৃপক্ষ। সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা আকরাম উজ্ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএম কনটেইনার ডিপোতে আল রাজি কেমিক্যালের চালানে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এখন তার খেসারত দিচ্ছে হচ্ছে আমাদেরও। রপ্তানি না করে অফডক থেকে আমাদের পণ্য ফেরত আনতে হচ্ছে।
গত ৪ জুন সীতাকুন্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে রাখা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কনটেইনারে আগুন ও ভয়াবহ বিস্ফোরণে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিস্ফোরণে দগ্ধসহ বিভিন্নভাবে আহত হন কয়েকশ মানুষ। ৭০ জনের বেশি এখনো ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনা তদন্তে গঠিত হয়েছে পৃথক ৬টি কমিটি। এ ঘটনায় ডিপোর ৮ কর্মকর্তাকে আসামি করে একটি মামলা করেছে সীতাকুন্ড থানা পুলিশ।