রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারা বিশে্বই পণ্যমূল্য বাড়তে শুরু করে। ফলে আমদানি ব্যয় বাড়তে শুরু করে বাংলাদেশে। এদিকে আমদানির মূল্য পরিশোধের জন্য বাড়তি ডলারের প্রয়োজন পড়ায় ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে মোট ৬৮৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে কখনোই এত ডলার বিক্রি করতে হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে; বরং দর স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত ডলার কিনত বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০-২১ অর্থবছর জুড়ে আমদানি কম ছিল এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় তুলনামূলক ভালো ছিল। সে কারণে বাজারে ডলারের দর কমে যাওয়া ঠেকাতে গত অর্থবছরে রেকর্ড ৭৯৩ কোটি ডলার ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫১৫ কোটি ডলার কেনার রেকর্ড রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কিন্তু কোনো বছরই খুব বেশি ডলার বিক্রি করতে হয়নি। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগে সর্বোচ্চ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১৩৪ কোটি ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এখন ডলার কেনার পরিবর্তে উল্টো বাজারে ডলার সরবরাহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও ডলারের দর ঊর্ধ্বমুখী। সম্প্রতি প্রায় প্রতিদিনই মান হারাচ্ছে টাকা। গতকাল মঙ্গলবার ডলারের বিপরীতে আরও ৩০ পয়সা মান হারিয়েছে স্থানীয় মুদ্রাটি। ফলে ১ ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোকেই এখন খরচ করতে হচ্ছে ৯২ দশমিক ৮০ টাকা।
এক দিন আগে, অর্থাৎ গত সোমবার আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ছিল ৯২ টাকা ৫০ পয়সায়। তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত ১৬ মে ডলারের দর ছিল ৮৬ দশমিক ৭০ টাকা। গত ১৭ মে ডলারের দর এক ধাক্কায় ৮০ পয়সা বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকে অনবরত ডলারের দর বাড়তে থাকে। সেই হিসাবে ৩০ দিনেই ডলারের দর বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ টাকা বা টাকার মান কমেছে ৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল সরকারি আমদানি বিল মেটাতে ৯২ দশমিক ৮০ টাকা দরে ব্যাংকগুলোর কাছে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিক্রি করে। ডলার বিক্রির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার মজুদ (রিজার্ভ) ৪ হাজার ১৪৪ কোটি ডলারে নেমে আসে।
বিভিন্ন ব্যাংক গতকাল আমদানি বিলের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে এক ডলারের বিপরীতে ৯৩ থেকে ৯৫ টাকা দাম নিয়েছে। নগদ ডলার বিক্রি করছে ৯৬ থেকে ৯৭ টাকা। ব্যাংকের বাইরে খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে নগদ ডলার বিক্রি হয় ৯৭ থেকে ৯৮ টাকায়।
এর আগে দেশে রেমিট্যান্স বাড়াতে ২ জুন ডলারের একক দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ওই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়, বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকগুলো নিজেরাই আগের মতো করে ডলারের দাম নির্ধারণ করতে পারবে। ওই সময় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার ছিল ৮৯ টাকা। এরপর আন্তঃব্যাংক ডলারের দর কয়েক দফায় বেড়ে ৯২ দশমিক ৮০ টাকা হয়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুলাই থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম ৮৪ দশমিক ৮০ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এরপর থেকে আমদানির চাপ বাড়তে থাকে। ডলারের দরও একটু একটু করে বাড়াতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২০২১ সালের আগস্টের শুরুতেও আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারের মূল্য একই ছিল। ৩ আগস্ট থেকে দু-এক পয়সা করে বাড়তে বাড়তে গত বছরের ২২ আগস্ট প্রথমবারের মতো ৮৫ টাকা ছাড়ায় ডলার। এ বছরের ৯ জানুয়ারিতে এটি বেড়ে ৮৬ টাকায় পৌঁছে। এরপর ২২ মার্চ পর্যন্ত এ দরেই স্থির ছিল। পরে গত ২৩ মার্চ আন্তঃব্যাংকে আরও ২০ পয়সা বেড়ে ৮৬ দশমিক ২০ টাকায় দাঁড়ায় ডলার। গত ২৭ এপ্রিল আরও ২৫ পয়সা বেড়ে ডলারের দর দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ৪৫ টাকা। গত ৯ মে দর বাড়ে আরও ২৫ পয়সা। ১৬ মে বাড়ে ৮০ পয়সা। ২৩ মে বাড়ে ৪০ পয়সা। ফলে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম গিয়ে ঠেকে ৮৭ দশমিক ৯০ টাকায়। এরপর গত ৩১ মে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারে ৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত ৩ জুন ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা, ৫ জুন ৯১ টাকা ৫০ পয়সা ও ৬ জুন দাঁড়ায় ৯১ টাকা ৯৫ পয়সায়। আর ৭ জুন ডলারের দার ৯২ টাকায় দাঁড়ায়। এরপর ৮ জুন ডলারের দর ৫০ পয়সা কমলেও পরের দিন ৯ জুন আবার ৯২ টাকা হয়। ১৩ জুন আরও ৫০ পয়সা বাড়ে। সর্বশেষ গতকাল আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে ডলারের দাম গিয়ে ঠেকে ৯২ দশমিক ৮০ টাকায়।
জানা গেছে, বাজারে ডলার সরবরাহ করাও বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৬০০ কোটি ডলারের মতো ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।