কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ বুধবার। নগর পিতা নির্বাচনের জন্য প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ভোটার তাদের রায় দেবেন। দেশে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ও প্রশ্ন থাকায় আইন করে গঠন করা প্রথম নির্বাচন কমিশনের অধীনে কুমিল্লার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে কি না সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। এ নির্বাচন কমিশনের ওপর সারা দেশের মানুষের আস্থা-অনাস্থার অগ্নিপরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে এ নির্বাচনকে।
কেননা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী এমন আত্মবিশ^াস জানালেও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র দুই মেয়র প্রার্থীর মুখে শঙ্কার কথা শোনা গেছে। অবশ্য এই তিন মেয়র প্রার্থীর যিনিই বিজয়ী হন না কেন, ভোটের মাঠে লড়াই ত্রিমুখীই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তাদের ধারণা, জয়-পরাজয় নির্ধারণও হবে অল্প ভোটের ব্যবধানে।
আজ সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। চলবে ৪টা পর্যন্ত। ২৭টি ওয়ার্ডের ১০৫ কেন্দ্রের ৬৪০টি বুথে ভোট নেওয়া হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে। এর মধ্যে ৮৯ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন মেয়র পদে প্রার্থী পাঁচজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের আরফানুল হক রিফাত (নৌকা), বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত গত দুবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু (টেবিল ঘড়ি), বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার (ঘোড়া), স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান বাবুল (হরিণ) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাশেদুল ইসলাম (হাতপাখা)। এছাড়া ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১০৬ ও ৯টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৬ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন।
কুমিল্লার নগর সংস্থার ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ২৯ হাজার ৯১৮। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২ এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৬ জন। ভোট দেবেন তৃতীয় লিঙ্গের দুজন ভোটারও।
ভোটের আগের দিন গতকাল মঙ্গলবার সকালে কুমিল্লার ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সার্বিক বিষয়ে কথা বলেন জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পুরো কুমিল্লা নগরী নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সব নেওয়া হয়েছে। নগরীর অন্তত ৭৫টি জায়গায় তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে।’
এ নির্বাচনে ২৭টি ওয়ার্ডে ২৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন উল্লেখ করে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেটদের পাশাপাশি ভোটের মাঠে ৩ হাজার ৬০৮ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আজ (গতকাল মঙ্গলবার) থেকেই কাজ করছেন বলে এসি জানান।
বহিরাগতদের ঠেকাতে চেকপোস্টে তল্লাশি জোরদারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তল্লাশি চালিয়ে চেকপোস্টে একজনকে আটক করা হয়েছে। তার কাছে একটি ছুরি পাওয়া গেছে।’
ইতিমধ্যে নির্বাচনী সরঞ্জাম বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো শেষ হয়েছে। সকাল থেকেই কুমিল্লা জিলা স্কুল অডিটরিয়ামে রাখা ইভিএম সব কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ১০৫টি কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা সরঞ্জাম গ্রহণ করেন।
লড়াই হবে ত্রিমুখী : গতকাল নগরীর অন্তত ১০টি ওয়ার্ড সরেজমিনে ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভোটারদের সঙ্গে কথা হয়েছে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের। তাদের হিসাব-নিকাশে উঠে এসেছে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস। তাদের অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ তুলে ধরেন। বর্তমান মেয়র মনিরুল হক সাক্কু, আওয়ামী লীগের আরফানুল হক রিফাত ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজামউদ্দিন কায়সারকেও বাদ দিচ্ছেন না হিসাব থেকে। অনেকেই একধাপ এগিয়ে গিয়ে সাক্কুকেই আবারও তৃতীয়বারের মতো নগর পিতার চেয়ারে বসার সমূহ সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে তারা সবাই বলেছেন, ফলাফল তো পরে, আগে কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পেতে হবে ভোটারদের।
৮নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ার বাসিন্দা বরকত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী রিফাত পিছিয়ে আছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের দলাদলির রাজনীতির কারণে। এ দলাদলি ভুলে নৌকার জন্য এখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ। ফলে নৌকার জয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকেই যায়।
তাছাড়া শহরের অনেক ভোটারের ভেতরে আতঙ্কের আভাস পাওয়া গেছে দাবি করে বরকত বলেন, ‘মানুষ চায় ভালোবাসা, ডেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলা। নৌকার প্রার্থী রিফাতের ছাতা হিসেবে যারা পেছনে রয়েছেন তিনি বা তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও ডেকে কথা বলার অভ্যেস একেবারেই নেই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করার মানসিকতা নেই রিফাত অনুসারীদের।’ তিনি বলেন, ‘ভোটার আকৃষ্ট করতে যে গুণগুলো রিফাত ও অনুসারীদের মধ্যে দেখা যায় না সেটাই দেখা যায় গত দুবারের মেয়র সাক্কুর মধ্যে। সে একই কারণে শেষ বেলায় জয়ী হওয়ার দৌড়ে চলে আসেন আলোচনার বাইরে থাকা কায়সার।’
বরকত জানান, কায়সার ২৭টি ওয়ার্ডের সব ভোটারের দরজায় কড়া নেড়েছেন। আবার বিএনপি অনুসারীর ভোটও কায়সারের বাক্সেই যাবে বলে তিনি মনে করছেন।
কুমিল্লার সিটি নির্বাচনে আফজল খান পরিবারের অবস্থান কী থাকবে জানতে চাইলে বরকত বলেন, ‘সেটা ভালোভাবে জানি না। তবে ওই পরিবার থেকে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কে জিতবে, কে জিতবে না সেটা না ভেবে নৌকায় ভোট দেওয়ার দরকার, তাই আমরা নৌকায়ই ভোট দেব।’ তবে প্রচারে নৌকার প্রার্থীর দুর্বলতা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
শহরের টমছম ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা পেশায় অটোরিকশাচালক রনি দেশ রূপান্তরকে সোজাসাপ্টা বলেন, ‘সাক্কু থাকলে শহরে আমরা অটো চালাতে পারব, সে মেয়র না হলে আমাদের অটোও চলবে না, পেটও ভরবে না।’ কেন রনির এমন ধারণা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই আমরা তো কুমিল্লারই মানুষ, কে কোন ধরনের তা বুঝতে পারি। নৌকার প্রার্থী ও তাদের দলের কোনো নেতাকর্মীরা রনির মতো একজন খেটে খাওয়া মানুষের এমন ভুল ভাঙাতে আসেননি। তার মতোই কুমিল্লায় খেটে খাওয়া অসংখ্য লোকের ভুল ভাঙাতে পারেননি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
১০ নম্বর ওয়ার্ডের কান্দিরপাড়ের নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে চায়ের টং দোকান দিয়ে সংসার চালান শিখা রানী দাস। বয়স প্রায় ৭০ বছর। সঙ্গে ৪০ বছর বয়সী ছেলে উজ্জ্বল সহকারী হিসেবে কাজ করেন দোকানে। ভোটের খবর জানতে কয়েকটি প্রশ্ন করা হলে মা ও ছেলে দুজনই বলেন, পুরনো মেয়রেই আস্থা রাখবে কুমিল্লার মানুষ। সাক্কুকে মিশুক বলেও দাবি করেন মা ও ছেলে।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তারা মিয়াও সাক্কুকেই এগিয়ে রেখেছেন। তবে তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের লোকজন সবাই যদি নৌকায় ভোট দেয় তাহলে পরিবর্তন ঘটবে। সবাই ভোট দেবে না এমন ধারণা হওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে তারা মিয়া বলেন, ‘এগুলো পুরনো গ্যাঞ্জাম। মিটেছে বলে মনে হয় না।’ তার দাবি, ‘কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ এসেছে আফজল খানের হাত ধরেই।’
২৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার শামসুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্কুর ভোটার বেশি নারী ও খেটে খাওয়া মানুষজন। অবশ্য বিএনপি অধ্যুষিত এই ওয়ার্ডে সাক্কু ও কায়সারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। এ ওয়ার্ডের মতো আরও আটটি ওয়ার্ড রয়েছে সাক্কু-কায়সারের নিয়ন্ত্রণে। তাছাড়া ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর এই ৯ ওয়ার্ডে ভোটার প্রায় ৬৫ হাজার। ষাটোর্ধ্ব শামসুল জানান, এখানে এই পরিমাণ ভোটের নিয়ন্ত্রক বিএনপি নেতা মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি গত সোমবার সাক্কুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
২৩ নম্বর ওয়ার্ডের এ ভোটার আরও বলেন, ‘শুনেছি কুমিল্লা শহরের জামায়াতি ভোটগুলোও বেশি যাচ্ছে সাক্কুর দিকে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ভোটাররাও ঝুঁকে আছেন সাক্কুর দিকে।’
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ চর্থার এক স্কুলশিক্ষক নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের দিন ব্যাজ পরবে নৌকার, ভোট দেবে ঘড়ি বা ঘোড়ায়। গত দুবার ওপরে নৌকা নৌকা করে গলা ফাটিয়ে বুথে গিয়ে নৌকার প্রার্থীকে যেভাবে হারানো হয়েছে, এবারও সেভাবে ভোট হতে পারে। আর নৌকার সঙ্গে আওয়ামী লীগ বেইমানি না করলে রিফাতের নৌকাই কুমিল্লা শহর চালাবে আগামীতে।’
এ স্কুলশিক্ষক আরও বলেন, ‘কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে এবার নৌকা জেতাতেও পারে আওয়ামী লীগ, হারাতেও পারে আওয়ামী লীগ।’
তবে ভোটসংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ও নৌকার প্রশ্নেও এখনো কুমিল্লায় আওয়ামী লীগে ঐক্য ফেরেনি। ভোটের আগে ঐক্য ফিরবে সে আশাও নেই স্থানীয় আওয়ামী লীগে। আর ভোটের দিন পর্যন্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করে রাখতে বেশ কিছু কৌশলে কাজ করছে স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী। যেহেতু আওয়ামী লীগে ঐক্য আসেনি তাই সাক্কুর মতো জয়ের স্বপ্ন দেখছেন কায়সারও। সাক্কু সুবিধাজনক অবস্থায় এসেছেন গত সোমবার, শহরের জামায়াতি ভোট ও মনিরুল হক চৌধুরী নিয়ন্ত্রিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটের নিশ্চয়তা পেয়ে।
মেয়র প্রার্থীরা কে কোথায় ভোট দেবেন : আওয়ামী লীগ প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার দুজনই ভোট দেবেন সকাল ৯টার মধ্যে। তারা ভোট দেবেন ভিক্টোরিয়া কলেজ রোডের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলকেন্দ্রে। এ কেন্দ্রে ভোট দেবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহারও। স্বতন্ত্র অন্য মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু ভোট দেবেন সকাল ১০টার পর ১২ নম্বর ওয়ার্ডের হোচ্ছামিয়া বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে।
কঠোর হুঁশিয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার : ভোটে অনিয়মের চেষ্টায় কেউ ছক কষলে কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ভোটারদের লাইনে বা বাইরে যেন কোনো অনাকাক্সিক্ষত জটলা না হয়, সেই প্রচেষ্টা আমাদের থাকবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো প্রার্থী বা কেউ যদি মনে করেন গোপন কক্ষে কাউকে বসিয়ে রাখবেন; এমন পরিকল্পনা যদি কারও থাকে তাহলে বলব, তা থেকে সরে আসুন। কোনোভাবেই এটা হতে দেওয়া যাবে না।’