দেশের স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যক্তির ব্যয় কমাতে মোট বাজেটের ৭-৮ শতাংশ অর্থ বরাদ্দের পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশ্লেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে বরাদ্দ বাজেটের যথাযথ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলেছেন, বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যক্তিকে মোট ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতে যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে, তাতে স্বাস্থ্যসেবা পেতে মানুষকে নিজেদের পকেট থেকে ৬৯ শতাংশ ব্যয় করতে হবে। এ ব্যয় ৫০ শতাংশে কমিয়ে আনতে হলে স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৭-৮ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ব্যয় হিসেবে নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হলরুমে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘কেমন হলো স্বাস্থ্য বাজেট ২০২২-২৩’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় আলোচকরা এসব কথা বলেন। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাত বরাদ্দ পেয়েছে ৩৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা এবারের জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অর্থ সময়মতো খরচ করতে না পারার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এর জন্য তিনি সহযোগী সরকারি সংস্থাগুলোর কাজের ‘ধীরগতিকে’ দায়ী করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে পরিমাণমতো বরাদ্দ আসে, কিন্তু অনেকের অভিযোগ আছে সক্ষমতার অভাবে তার অধিকাংশই মন্ত্রণালয় খরচ করতে পারে না। কিন্তু এটা মন্ত্রণালয়ের কারণে হয় না। মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা থাকলেও সহযোগী অন্য সংস্থাগুলোর কারণে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয় না।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বরাবরই আমাদের বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতি। কিন্তু আমরা আসলে পারিপার্শ্বিকতার শিকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের কিছু করার থাকে না। আমাদের বেশিরভাগ কাজ পিডব্লিউডি করে থাকে, তারা অনেক ধীরগতিতে কাজ করে। তারা তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, যে কারণে সেখানে আমাদের কোনো হাত নেই।’
কাজে ধীরগতির উদাহরণ দিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, ‘গত বছর চারটি মেডিকেল কলেজের কাজের মধ্যে তিনটির দরপত্র আহ্বান করার পরও কাজ এগিয়ে নেওয়া যায়নি। এছাড়া যেকোনো খরচের জন্য সবার আগে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র আনতে হয়, সেখানে অনেক সময় লাগে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এবার সেটা বেড়ে হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার ১২ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু গতবার এ বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ শতাংশ। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার বাজেট কম বেড়েছে। আমরা মনে করি, বাজেটটি গত বছরের মতো হওয়া উচিত অথবা বেশি হওয়া উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে যে বাজেট দেওয়া হয়, সেটাও ঠিকমতো খরচ করতে পারে না মন্ত্রণালয়। অনেক সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরে গিয়ে ফাইল আটকে থাকে অথবা দেরি হয়। ফলে কাজও শুরু হয় দেরিতে। কিছু প্রকল্প সম্প্রসারণ ছাড়া স্বাস্থ্য বাজেটে নতুনত্ব নেই। বরাদ্দের বৃদ্ধি মূলত ক্রমবর্ধমান ব্যয়। করোনার মতো মহামারী মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে তেমন কোনো বরাদ্দ নেই।’
এ স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন, ‘অনেক খাতে বরাদ্দ বাড়লেও ব্যয়ের সক্ষমতা ও দক্ষতা নেই। এ কারণে বাজেট অব্যবহৃত থেকে যায়। এসব বিষয় সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের ভেতরেরও নানা ধরনের সমস্যা আছে। প্রশাসনের নিচের পদে যারা চাকরি করেন, তারা দীর্ঘদিন এক স্থানে চাকরি করলে একধরনের গোষ্ঠী তৈরি হয়। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে এসব সমস্যার সমাধানও করতে হবে।’
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের (বিএনএইচএ) ১৯৯৭-২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে আলোচকরা জানান, দেশে জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বরাদ্দ মাথাপিছু পড়ে মাত্র ৪৫ ডলার। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভারত, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় যথাক্রমে বরাদ্দ ৫৮, ৭৩, ১০৩ ও ১৫৭ ডলার। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ বাংলাদেশে।
অনুষ্ঠানে হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের বাজেট বিশ্লেষণে বলা হয়, এবার বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুব বাড়েনি। প্রায় এক দশক ধরেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকে জাতীয় বাজেটের ৫-৬ শতাংশের মধ্যে। এবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ১৯৮ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ১৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিচালন ব্যয় ১৩ হাজার ৪৩০ কোটি, যা চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এছাড়া উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৮৫১ কোটি, যা চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ১৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা।
ফোরাম আরও জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বিগত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ঘোষিত বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ফোরামের বিশ্লেষণে বলা হয়, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে, ব্যয় হিসেবে নয়। কারণ স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে সুস্থ মানবসম্পদ। প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সুস্থ সবল মানবসম্পদের কোনো বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির, পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম, টিকা কর্মসূচির পরিচালক ডা. শামসুল হক, স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ এবং হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বীসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন।