প্রশ্নের মুখে ইভিএম

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে নতুন নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনকেও (ইভিএম) পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে উতরে গেলেও ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। ভোটার, প্রার্থী সবার কাছ থেকেই এ প্রশ্ন এসেছে। তারা বলছেন, এ পদ্ধতিতে যেখানে দ্রুত ভোটগ্রহণ সম্ভব হয় বলে প্রচার আছে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ভোটগ্রহণে ছিল ধীরগতি। যন্ত্র নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এর আগে কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে হওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আইন করে নিয়োগ করা হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নতুন ইসিও তাদের কুমিল্লায় প্রথম পরীক্ষায় একই প্রশ্নের মুখে পড়ল। গত মে মাসে সরকারি দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ইভিএমের জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। তখন ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট নেওয়া ইসির পক্ষে সম্ভব হবে কি না সেই প্রশ্ন ওঠে।

গতকাল বুধবার কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে ইভিএমে। নগরের ১০৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়। কোথাও তেমন কোনো গোলযোগ হয়নি। আশঙ্কা করা হলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর লোকজনের দাপট দেখা যায়নি। প্রার্থীদের কাছ থেকেও এ নিয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর পর বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ইভিএম নিয়ে অভিযোগ আসতে শুরু করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৩০টি কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি বুথে ইভিএম বিকল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কারিগরি দল যন্ত্র ঠিক করতে পারলেও কমপক্ষে ৪০ মিনিট সময় লেগে যায়।

সকাল ৮টায় নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কুমিল্লা হাই স্কুল নারী ভোটার কেন্দ্রে ইভিএমে সমস্যা দেখা দেয়। ছয়টি বুথের এক নম্বর বুথের যন্ত্রটি বিকল হয়ে যাওয়ায় ৪১ মিনিট কোনো ভোট নেওয়া হয়নি। পরে ইভিএম পাল্টে ভোট শুরু হয়।

মডার্ন বিদ্যালয়ে স্থাপিত আরেকটি কেন্দ্রে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে মোটে ৬৩৩টি (৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ), সেখানে মোট ভোটার ২০১৫ জন। দুপুর ১টার দিকে মডার্ন বিদ্যালয় কেন্দ্রের শেখ রাসেল ভবনের সামনে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব সাবিনা রানী দাসের সঙ্গে। লম্বা লাইন দেখে তিনি তখন ফিরে যাচ্ছিলেন। সাবিনা বলেন, ‘অনেক ভিড়। এহন ভোটটা দিতে পারি নাই। ঘর গুছাইয়া ৩টার দিকে আবার আসমু।’

সাবিনার সঙ্গে থাকা গীতা রানী একটি হাসপাতালে কাজ করেন। তিনি এক ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার পর ফিরে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘কম্পিউটারে ভোট দিতে সময় লাগতাছে অনেক বেশি। আমার ডিউটি আছে, পরে সময় পাইলে আবার আসমু।’

মডার্ন বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল দীর্ঘ লাইন। ভেতরে থাকা বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্টরা জানালেন, একেকজনের ভোট দিতে গড়ে এক মিনিটের বেশি সময় লাগছে। ভোটটি কীভাবে দেবেন, অনেকে বুঝতেই পারছেন না। প্রিসাইডিং অফিসার রফিজুল ইসলামকে দেখা গেল দাঁড়িয়ে ভোটারদের বুঝিয়ে বলছেন কী করতে হবে।

তবে ৩১ নম্বর ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসা বিলকিস আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এবার প্রথম ভোট দিতে এসেছি।’ ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিয়ে তিনি বলেন, ‘মনমতো ভোট দিয়েছি।’ ৭০ বছরের বয়সী প্রমিলা দেবীও বলেন, ‘ভালোভাবে ভোট দিয়েছি। তেমন অপেক্ষায় থাকতে হয়নি।’

আবার ২৯ নম্বর কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘মনে হচ্ছে ধীরগতি পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ চলছে। আমি দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি।’ কেন্দ্রটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ২৯০টি। দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৩১ শতাংশ। আবার একই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা ৫৫ বছর বয়সী শাজাহান বলেন, ‘ইভিএমে ভোট দেওয়া তেমন কঠিন মনে হয়নি।’

এ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং অফিসার জায়েদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকালে বৃষ্টি হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি কম হয়। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেলে একসঙ্গে অনেক ভোটার উপস্থিতি ঘটে। ফলে জটলা লাগে।’

১৯ নম্বর কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা রুনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আঙুলের ছাপ নেয় না। আমি সহযোগিতা চাইলে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি আবার বাসায় গিয়ে হেক্সিসল দিয়ে কেন্দ্রে এসেছি, দেখি ভোট দেওয়া যায় কি না।’ এ প্রসঙ্গে প্রিসাইডিং অফিসার মোতাহের হোসেন বলেন, ‘এমন কাউকে আমি খুঁজে পাইনি। এ কেন্দ্রে দুপুর ৩টা পর্যন্ত ৪৭ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়।’

নির্বাচন নিয়ে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুর ছোট ভাই ও তার প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক কাইমুল হক রিঙ্কু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোট নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ নেই। তবে ভোটগ্রহণ সেøা ছিল। এ কারণে ভোট দিতে আসা অর্ধেক নারী ভোটার চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।’ তার দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, ‘বেশিরভাগ কেন্দ্রে ইভিএম বিকল হয়েছে। যন্ত্র সচল করতে কমপক্ষে ৪০ মিনিট সময় লেগেছে।’ জোড়াতালির ইভিএম দিয়ে এত বড় ভোট করা ঠিক হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইভিএম নিয়ে একইরকম অভিযোগ করেন আরেক মেয়রপ্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সারও।

সাক্কু বিএনপিতে আর কায়সার বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলে ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ভোটে অংশ নেওয়ায় তারা বহিষ্কৃত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আতিকুল্লাহ খোকন ইভিএম নিয়ে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘ইভিএম সেøা। তাই কোথাও ভিড়।’

ভোটগ্রহণে ধীরগতির কথা অনেক কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসাররাও স্বীকার করেছেন। এর কারণ সম্পর্কে দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, নারী ভোটকেন্দ্রে এ অসুবিধা হয়েছে। অনেক বয়স্ক ও অসুস্থ নারী ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেন। যেখানে এক মিনিটে ভোট দেওয়া সম্ভব, সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ মিনিটও লেগেছে।

৭৬ নম্বর কেন্দ্রের দায়িত্ব পালনকারী প্রিসাইডিং অফিসার সোহেল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারী কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ একটু ধীরগতিতে হয়েছে। তাছাড়া সব মিলিয়ে ধীরগতিতে ভোটগ্রহণের অভিযোগ একেবারে সত্য নয়।’

এদিকে ভোটার নম্বর নিয়ে কেন্দ্রে না আসায় অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে এলেও ভোটগ্রহণের দায়িত্ব থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছেন বিভিন্ন কেন্দ্রের ভোটাররা। ৩১ নম্বর কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা সাঈদা ইসলাম (৪৫) ভোটার নম্বর না আনায় বুথে গিয়েও ভোট দিতে না পেরে বাড়ি ফিরে গেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে কোনো সহযোগিতা পাইনি আমি।’

ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকা ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবেদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইভিএমে ভোটগ্রহণে ধীরগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন কেন্দ্রে। এতে ভোটাররা কষ্ট পাচ্ছেন।’ তার মতে, ‘ভোটের আগে ভোটদানের বিষয়ে যে প্রচার প্রয়োজন ছিল, তা যথেষ্ট ছিল না। সাধারণ ভোটাররা ইভিএমের সঙ্গে আগে পরিচিত হতে পারেননি। অনেককে ভোট দিতে গিয়ে দুই-তিনবার চেষ্টা করতে হয়েছে।’

তবে রিটার্নিং অফিসার শায়েদুন্নবী চৌধুরী বলেছেন, ‘পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ পাইনি। তবে ধীরগতি নিয়ে অভিযোগ পেয়েছি।’ সকালে রানীর দীঘিরপাড় ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে এসে সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন তিনি।

শায়েদুন্নবী চৌধুরী বলেন, ‘ধীরগতির কথা যেটা বললেন, সেটা একজন ভোটার তিনটা পদে ভোট দেন, প্রথম প্রথম একটু হয়তো চিন্তা করেন যে কীভাবে ভোট দেবেন। এজন্য একটু ধীরগতি হতে পারে।’

ইভিএম সম্পর্কে রিটার্নিং অফিসার বলেন, ‘ইভিএম সব ঠিকঠাক কাজ করছে এরকম নয়। আমাদের মোবাইল কারিগরি টিম আছে তারা সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছেন। মেজর (বড় ধরনের) কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। একটু অনভ্যস্ততার কারণে এরকম হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ পরিস্থিতি বলেন বা সার্বিক পরিস্থিতি বলেন, আমি তো মনে করি শান্তিপূর্ণ আছে। আমি পোলিং এজেন্টদের জিজ্ঞেস করেছি, ওনারাও আমাকে নিশ্চিত করেছেন সুষ্ঠুভাবে ভোট হচ্ছে।’