হাইকোর্টের এজলাসে এসে ‘ধর্ষণের’ বিচার চাইল কিশোরী

ধর্ষণের শিকার হলেও আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছেএমন অভিযোগ নিয়ে সরাসরি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের এজলাসে গিয়ে বিচার চেয়েছে নীলফামারীর এক কিশোরী। আদালত তার বক্তব্য শুনে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে আইনগত সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি শাহেদ নূর উদ্দিনের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই বেঞ্চের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এর কিছুক্ষণ পরই এজলাসের ডায়াসের সামনে এসে দাঁড়ান এক কিশোরী (১৫) ও তার মা (৪৫)। আদালত জানতে চান তাদের পরিচয় কী, কী কারণে এসেছেন। এ সময় কিশোরী তার নাম উল্লেখ করে বলে, তারা নীলফামারীর বাসিন্দা। বিজিবিতে (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) কর্মরত এক সৈনিক তাকে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু নীলফামারীর একটি আদালত আসামিকে খালাস (অব্যাহতি) দিয়েছে। কিশোরী আরও বলে, ‘আমরা গরিব মানুষ। মামলা চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। আপনাদের কাছে বিচার চাই।’ সরাসরি হাইকোর্টের এজলাসে এসে কিশোরীর এমন বক্তব্যে উপস্থিত আইনজীবীরা কিছুটা হতবাক হয়ে যান।

হাইকোর্ট এ সময় কিশোরী ও তার মায়ের কাছে মামলাসংক্রান্ত কোনো নথি আছে কি না জানতে চান। জবাবে কিশোরী তা আছে বলে জানায়। আদালত তখন এজলাসের ভেতরে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের কোনো প্যানেল আইনজীবী উপস্থিত আছেন কি না জানতে চাইলে বদরুন্নাহার নামে এক আইনজীবী তাতে সাড়া দেন। হাইকোর্ট তখন এই আইনজীবীকে বিষয়টি দ্রুততার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তা দিতে নির্দেশ দেয়।

কিশোরীর মা দেশ রূপান্তরকে জানান, তার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে ওই কিশোরী দ্বিতীয়। সে এসএসসি পরীক্ষার্থী। ধর্ষণের ঘটনায় আসামি অব্যাহতি পেয়েছেন। বিচার চাইতে হাইকোর্টে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন তিনি। কারও পরামর্শ বা প্ররোচনায় আসেননি।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর কিশোরীর মা নীলফামারীর সৈয়দপুর থানায় করা একটি এজাহারে উল্লেখ করেন, প্রতিবেশী যুবক আক্তারুজ্জামান (২৮) বিজিবিতে সৈনিক পদে কর্মরত। ৯ নভেম্বর পরিবারের অন্য সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগে তার ১৪ বছরের মেয়েকে মোটরসাইকেলে করে বোনের বাচ্চা দেখানোর কথা বলে নিয়ে যান আক্তারুজ্জামান। পরদিন বাসায় দিয়ে গেলেও মেয়ের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। এরপর নীলফামারী সদর হাসাপাতালে নেওয়ার পর সেখানে কিশোরীর ছাড়পত্রে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে রেফার্ড (স্থানান্তর) করা হয়। মায়ের অভিযোগ, ৯ থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে কোনো একসময়ে আসামি আক্তারুজ্জামান কিশোরীকে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় একটি মামলা রজু করে সৈয়দপুর থানা পুলিশ। ১৪ নভেম্বর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিশোরীর মেডিকেল প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুক্তভোগী মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তার মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসায় আসার পর মেয়ে অসংলগ্ন আচরণ শুরু করে।

সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড প্যানেলের আইনজীবী বদরুন্নাহার জানান, মামলার তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর আক্তারুজ্জামানের অব্যাহতির আরজি জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে না-রাজির আবেদন করেন মামলার বাদী। শুনানি শেষে নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল- ১ চূড়ান্ত প্রতিবেদন সঠিক উল্লেখ করে না-রাজির আবেদন খারিজ করে দেয়।  গত ৩১ মে প্রকাশিত আদেশে উল্লেখ করা হয়, নথিপত্রে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারার জবানবন্দিতে আসামিকে না জড়িয়ে নীলফামারী শহরের একটি ক্লিনিকের একজন ওয়ার্ডবয়কে ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাই অভিযোগের কোনো সত্যতা না পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সঠিকভাবে এই মামলার তদন্ত করেছেন।

আইনজীবী বদরুন্নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার চাইতে সরাসরি আদালতে হাজিরের এমন ঘটনা হাইকোর্টের কোনো বেঞ্চে হয়েছে কি না জানা নেই। হাইকোর্টের মৌখিক নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মামলাসংক্রান্ত সকল নথি পর্যালোচনা করছি। বাদীর আবেদন খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আমরা হাইকোর্টে আপিলের প্রস্তুতি শুরু করেছি।’