এজলাস ধার করে চলে নারী-শিশু ট্রাইব্যুনাল

এজলাস ধার করে চলে ঢাকার একাধিক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ। দেশের সবচেয়ে বড় বিচারাঙ্গনের নয়টি ট্রাইব্যুনালের তিনটি আদালতের বিচারকাজ চলে সকাল ও দুপুরে এজলাস ভাগাভাগি করে। এতে করে নষ্ট হচ্ছে আদালতের মূল্যবান কর্মঘণ্টা। আদালতের বিচার কার্যক্রমের সময় কমে যাওয়ায় বিচারপ্রার্থীরাও বিচারে বিলম্বসহ নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফলে বিচারপ্রার্থীর দ্রুত ও ন্যায়বিচারের যে প্রত্যাশা সেটি পূরণ হচ্ছে না।

আইনবিদ, মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মীদের অভিমত, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অনেক ক্ষেত্রে লোকলজ্জা এবং হয়রানির শঙ্কায় থানায় মামলা করতে অনীহা রয়েছে ভুক্তভোগীদের। এ ক্ষেত্রে ভরসা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের বিচার করতে এজলাস ভাগাভাগির এমন পরিস্থিতিতে বিস্ময় প্রকাশ করে তারা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় এমনিতেই দীর্ঘসূত্রিতা ও ভোগান্তি রয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ধর্ষণ মামলার বেশিরভাগ আসামি খালাস পায়। এ ক্ষেত্রে আদালতের পরিবেশ ও সাক্ষীর গরহাজিরার মতো অব্যবস্থাপনাকে বড় কারণ হিসেবে মনে করেন তারা। এভাবে চললে বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগীর বিচারের প্রত্যাশা তো পূরণ হবেই না, পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়বে বলে মনে করেন আইনবিদ, মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মীরা।

ঢাকার নয়টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি আইন ও আদালতসংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা যে ধারণা দিয়েছেন তাতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২২ হাজারের মতো। এসব আদালতেই কর্মদিবসের নির্দিষ্ট সময় কিংবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে আইনের সঙ্গে সংঘাতে আসা শিশুদের বিচারকাজ হয়।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবনের পঞ্চম তলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তথ্যমতে, এ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন প্রায় তিন হাজার মামলা। ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ চলে পালাক্রমে। সকাল ১০টা থেকে ট্রাইব্যুনাল- ৯ এর বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর দুপুর দেড়টা থেকে বিকাল পর্যন্ত একই এজলাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর বিচারকাজ চলে। ট্রাইব্যুনাল-৯-এ বিচারাধীন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মামলা।

অন্যদিকে আদালতপাড়ার রেবতি ম্যানশনের তিনতলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাস। এ আদালতে বিচারাধীন হাজারের বেশি মামলা। এখানে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ চলে। মানব পাচারের ১ হাজার ৬৫ মামলা বিচারাধীন। এরপর বিকেল পর্যন্ত চলে নারী শিশু ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকাজ।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ট্রাইব্যুনাল সরেজমিনে ঘুরে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্পর্শকাতর মামলা পরিচালনার মতো পরিবেশ, অবকাঠামো ও এজলাস এসব আদালতে অনেকাংশে নেই। নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। ভুক্তভোগী, সাক্ষী, আইনজীবীদের বসার মতো যথেষ্ট আসন যেমন নেই তেমনি দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা নেই। বিচারপ্রার্থীকে আদালতের করিডোরে অপেক্ষায় থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগী সাক্ষীকে দীর্ঘ সময় নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিতে হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ভুক্তভোগীকে জেরা করেন উন্মুক্ত আদালতে। আসামির নির্ধারিত কাঠগড়াও অনেকটা ভাঙাচুরা।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতে প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার চাপ বেশি থাকায় এই ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারপ্রার্থীদের ভিড় এমনিতেই বেশি থাকে। আর আদালতের যে পরিবেশ তাতে বাধ্য হয়েই এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ সারতে হয়। অনেক দিন ধরেই এ সমস্যা হচ্ছে। নতুন কোনো ভবন ও এজলাস না হওয়া পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে না।’

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালগুলোতে অবকাঠামোর সংকটে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে। প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করায় বিচারকদের এতে কিছুই করার নেই। বিধান অনুযায়ী, ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীর সুরক্ষায় রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচারকাজ করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘বাজেটে বিভিন্ন খাতে বেশি পরিমাণ বরাদ্দ হচ্ছে। কিন্তু যেখানে মানুষের দ্রুত ও ন্যায়বিচার পেলে সামাজিক পরিস্থিতি ভালো থাকবে সেখানে তেমন কিছু নেই। এ নিয়ে আইন ও বিচারাঙ্গনের কাউকে কথা বলতে দেখি না।’

ধর্ষণের মামলা চলে বছরের পর বছর : ২০১১ সালের ১৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়া থেকে ধামরাই এলাকায় অসুস্থ মাকে দেখতে যান এক পোশাককর্মী (২৯)। ওইদিন ধামরাইয়ের হাতকোড়া এলাকায় দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ওই নারী। এ ঘটনায় ধামরাই থানায় চারজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়। ওই বছরের ২০ আগস্ট ফরেনসিক প্রতিবেদনেও ধর্ষণের আলামত মেলে। তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলাটির বিচারকাজ চলছে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯-এ। মামলায় নথিপত্রে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে ১৪ জনের।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, আট বছরের বেশি সময়ে শুধু প্রথম সাক্ষী ভুক্তভোগীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। বিচারে বিলম্বের সুযোগে ইতিমধ্যে চার আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছে। আট বছর ধরে শুধু তারিখের পর তারিখ পড়ে। সাক্ষীর গরহাজিরায় বিচারকাজ কবে শেষ হবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবার।

এই আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সহিদ হোসেন ঢালী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অসংখ্য মামলা বছরের পর বছর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে। কিছু নিষ্পত্তি হয় আবার নতুন মামলা আসে। এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলার জন্য পৃথক এজলাস হলে ভালো হয়।’

১৮০ দিনে বিচার নিষ্পত্তির নজির নেই : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী, এ আইনের অধীনে সব মামলা নিষ্পত্তি হবে ১৮০ দিনে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মামলা শেষ হয়েছে এমন নজির নেই বলে জানান রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এছাড়া বিচার শেষ করতে নির্ধারিত সময়ের উল্লেখ থাকলেও এটি প্রতিপালিত না হলে কী ধরনের আইনিপন্থা অনুসরণ করতে হবে সে বিষয়ে আইনে কিছু বলা নেই। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৩১ (ক) বিধান অনুযায়ী, কোনো মামলা বিচারের জন্য পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না (বিচারকার্য) হওয়ার কারণ জানাতে অধস্তন আদালতের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আবদুল বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনের স্বল্প সময়ে দুটি স্পর্শকাতর আদালতের বিচারকাজ একই এজলাসে হওয়ায় বিলম্ব হওয়া স্বাভাবিক। এমনও হয় দুপুর গড়িয়ে গেলেও আমরা মামলার নথি পাই না। সাক্ষীদের প্রস্তুতি ও নথি পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকে না। এতে করে সাক্ষীও আসে না। ফলে আসামিপক্ষ এ সুবিধাটা নিচ্ছে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্লাস্টের (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলা এভাবে চললে ন্যায়বিচার তো সুদূরপরাহত, বিচারই হবে না। আমাদের আদালতগুলোর যে পরিবেশ তাতে উন্মুক্ত আদালতে ধর্ষণের শিকার নারীকে জেরা করা হয়। এটাও একধরনের নির্যাতন।’ তিনি বলেন, ‘বিচারকদের কী-ইবা করার আছে? তাদের অবকাঠামো, পরিবেশ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ও সাক্ষী দরকার। কিন্তু এসবের জন্য বাজেট বরাদ্দ যেখানে দ্বিগুণ করা উচিত সেখানে তা কমেছে।’