ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বেই পণ্যমূল্য বাড়ছে। যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা ঠিক রাখতে ঋণ পরিশোধে ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে পুরো কিস্তি না দিলেও নির্দিষ্ট একটি পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমা দিলে ঋণ নিয়মিত করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সুবিধা দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় গভর্নর ফজলে কবির এ আশ্বাস দেন। সভার শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
এর আগে গত ৩১ মে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে করোনা মহামারীতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে ঋণ পরিশোধে যেভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তেমন করে চলতি ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুবিধা চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে আবেদন করেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।
গতকালের সভায় ওই বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনা করেন গভর্নর ফজলে কবির। প্রসঙ্গত, আগামী ৩ জুলাই গভর্নর ফজলে কবিরের চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর আগে ব্যাংক এমডিদের সঙ্গে এটাই ছিল গভর্নরের শেষ সভা।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক ও সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সভার বিষয়ে একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) বলেন, ব্যবসায়ীরা দুই বছর ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি তারাও এ সুবিধা নিয়েছে। অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানের এ সময়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকলেও তারা ঋণ পরিশোধ করেনি। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি সচল তাই নতুন করে সুবিধা দিলে ব্যাংকগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হবে। হতাশ হবেন ভালো গ্রাহক।
অন্যদিকে কিছু ব্যাংকের এমডি নতুন করে ঋণ সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, এখনো পুরোপুরি করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠেনি আর্থিক খাত। এছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং পণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তাই নতুন করে যুক্তিসংগত পরিমাণ ডাউন পেমেন্টে জমা নিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোরাটোরিয়াম সুবিধা দেওয়া হোক।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয় সে বিষয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ অভিজ্ঞ আইনজীবীর অভাবে অনেক সময় মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাংকের ঋণ আদায় কার্যক্রম। মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সভা শেষে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেইন বলেন, যেহেতু গভর্নর ফজলে কবিরের এটাই শেষ মিটিং ছিল ব্যাংকারদের নিয়ে, সেহেতু বিগত সময়গুলোতে ঘটে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সভায়। এর মধ্যে ব্যাংকে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ ও এফবিসিসিআইয়ের আবেদন ছিল অন্যতম। এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এর জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
তিনি আরও জানান, ব্যাংকারদের জন্য একটি বিশেষ হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যেমন পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর জন্য রয়েছে। তাদের মতো ব্যাংকার ও তাদের পরিবারের জন্য বিশেষ হাসপাতাল থাকলে করোনার মতো গুরুতর সময়গুলোতে ভোগান্তি কম হবে। তবে ঋণ বিতরণের সর্বোচ্চ সুদহার নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।