জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর দাবিতে অভিনব পন্থায় বিক্ষোভ করেন নাসা বিজ্ঞানী পিটার কালমাস। তার সঙ্গে আরও ছিলেন প্রকৌশলী, পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানের শিক্ষক তিন বন্ধু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাড়া জাগানো কালমাসদের বিক্ষোভ কি বিশ্বনেতাদের সচেতন করবে? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
ব্যাংকের সামনে প্রতিবাদ
যুক্তরাষ্ট্রে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে জলবায়ু বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন পিটার কালমাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে ল্যাবরেটরিতে যাওয়া তার নিত্যদিনের কাজ। এক দিন এর ব্যতিক্রম ঘটে। নাসার ল্যাবরেটরিতে না গিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের উপকণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম ব্যাংক জেপি মরগ্যান চেজের কার্যালয়ে তিন বন্ধুকে নিয়ে হাজির হন কালমাস। ওই তিনজন পেশায় পদার্থবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানের শিক্ষক। ভেতরে প্রবেশ না করে তারা ব্যাংকের প্রধান দরজার হাতলের সঙ্গে নিজেদের হাত শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের এমন কর্মকাণ্ডে অবাক হন সাধারণ মানুষ। কালমাসসহ চারজন নিজেদের এভাবে ব্যাংকের দরজার সঙ্গে বেঁধে ফেলার অর্থ প্রথমে কেউ বুঝতে পারেননি। তারা কিছু একটার প্রতিবাদ করতে চাইছেন এবং মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এমন অভিনব কায়দা বেছে নিয়েছেন তা অবশ্য দ্রুতই বোধগম্য হয় তাদের। সময় আরও গড়ালে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন কালমাস ও তার তিন বন্ধু। এ কারণে তারা প্রতিবাদ করছেন। প্রশ্ন ওঠে, এত জায়গা থাকতে ব্যাংকের সামনে প্রতিবাদ কেন? তাও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করে, তাদের প্রচুর আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে মার্কিন বহুজাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেপি মরগ্যান চেজ। শুধু তা-ই নয়, জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে অন্য ব্যাংকগুলোর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করে ওই ব্যাংক। ২০২০ সালে জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে ৫১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংক। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল এই পাঁচ বছরে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ব্যাংকটির ব্যয় ছিল ৩১৭ বিলিয়ন ডলার। জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের কারণে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকটির সামনেই প্রতিবাদের উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেন কালমাস ও তার বন্ধুরা। শুধু তিনিই নন, ২৬টি দেশের ১ হাজার ২০০ বিজ্ঞানী এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে নিজ নিজ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের জন্য বহুজাতিক কোম্পানি ও সরকারকে দায়ী করে বিক্ষোভ করেন। এপ্রিলের ৬ তারিখে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে একপর্যায়ে কালমাসসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ। গ্রেপ্তারের আগে নাসার জৈবিক ব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন বিজ্ঞানী ৪৮ বছর বয়সী পিটার কালমাস বলেন, ‘বিজ্ঞানীদের কথা শোনা হচ্ছে না। আমাদের এই চমৎকার গ্রহ ও আমার ছেলেদের জন্য ঝুঁকি নিতে রাজি আছি আমি। কয়েক দশক ধরে আমরা সবাইকে সতর্ক করার চেষ্টা করছি এই বলে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছি আমরা কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। বিজ্ঞানীদের অবহেলা করা হচ্ছে। আমরা সবকিছু হারাতে যাচ্ছি। আমরা (বিজ্ঞানীরা) মজা করছি না, মিথ্যা বলছি না, অতিরঞ্জিতও করছি না। বিশ্বের সব শিশুর জন্য আমরা জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছি, নেব।’ ওই সময় জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়ন বন্ধে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান কালমাস ও তার বন্ধুরা। একই সঙ্গে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প বন্ধেরও আহ্বান জানানো হয়।
দেশে দেশে প্রতিবাদ
পিটার কালমাসের দেখাদেখি আরও অনেক বিজ্ঞানী ওই মাসে অভিনব পন্থায় জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিহতের দাবিতে প্রতিবাদ করেন। এদের একজন হলেন মৃত্তিকা বিজ্ঞানী রোজ আব্রামঅফ। ওয়াশিংটন ডিসিতে তার সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন বিক্ষোভকারী। হোয়াইট হাউজের এক সীমানা বেড়ার সঙ্গে আব্রামঅফ ও তার সাথীরা নিজেদের বেঁধে ফেলেন। তাদেরও পরে গ্রেপ্তার করা হয়। আব্রামঅফ বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা আর চুপ করে থাকবেন না। তারা এখন রাস্তায় নামছেন। দীর্ঘদিন পক্ষপাতহীন অবস্থায় ছিলাম, যা আমাকে যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু দেয়নি। সত্য বলার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার লক্ষ্যে কাজ করা রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে না।’
এপ্রিল মাসে ২৬টি দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিক্ষোভে শুধু বিজ্ঞানীরাই নন, সাধারণ মানুষও অংশ নেন। লন্ডনে ২৫ ব্যক্তি বৈজ্ঞানিক কাগজপত্রে আঠা লাগিয়ে সেসব সেটে দেন যুক্তরাজ্যের বিজনেস, এনার্জি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্ট্র্যাটেজি বিভাগের জানলায়। আঠা লাগানো হাতে পরিবেশবিদ অ্যারন থিয়েরি বলেন, ‘সরকার পাগল হয়ে গেছে। সরকারি এই ভবনের জানলায় আঠা লাগানো ছাড়া আর কী করা উচিত আমার জানা নেই। জনগণকে সচেতন করার জন্য তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ এদিকে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পার্লামেন্ট ভবনের সিঁড়িতে লাল রং নিক্ষেপ করে শতাধিক বিক্ষোভকারী। এদের মধ্যে ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্পেনের জাতীয় গবেষণা পরিষদের গবেষণা অধ্যাপক ফার্নান্দো ভ্যালাদারেস বলেন, ‘পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, আমাদের প্রতিবাদ শুধু তার জন্য নয়। আমরা এখানে প্রতিবাদে জড়ো হয়েছি বর্তমানের জন্যও। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে, লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে, উপকূলীয় অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে এসব কে না জানে! আর কত জানলে পরে মানুষ উঠে দাঁড়াবেন? পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার সংগ্রামে নামবেন?’
চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে সতর্ক করে বলা হয়, ‘এখনই জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিহত করতে হবে, পরে করলে কোনো লাভ হবে না। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ ছাড়া বিকল্প পথ নেই।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবী জুড়ে জলবায়ু কর্মীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর দাবিতে রাস্তায় নামেন পিটার কালমাসসহ অন্য বিজ্ঞানীরা।
এক দশক আগে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা ছেড়ে আর্থ সায়েন্সের দিকে ঝোঁকেন পিটার কালমাস। দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা একা দুনিয়া বদলাতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রাইডেস ফর ফিউচার নামে জলবায়ুকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন বিজ্ঞানী কালমাস। একপর্যায়ে জলবায়ু কর্মী হিসেবে নাম হয় তার। ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে জলবায়ু-সংক্রান্ত বৈঠকে নিয়মিত অংশ নিতে শুরু করেন কালমাস। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা করেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় কালমাস বুঝতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে হলে অসহযোগ আন্দোলনের বিকল্প নেই।
শুধু নাসা বিজ্ঞানী কালমাস নন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন অন্য বিজ্ঞানীরাও অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তারা ধীরে ধীরে বিজ্ঞানী বিদ্রোহ নামে এক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত যুক্তরাজ্যে এ সংগঠনের কাজ শুরু হয়। সেখান থেকে বিজ্ঞানী বিদ্রোহের কাজ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এপ্রিল মাসে ব্যাংক, হোয়াইট হাউজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি ভবনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যেসব বিক্ষোভ হয়, তা বিজ্ঞানী বিদ্রোহেরই কর্মসূচি ছিল। বিজ্ঞানী বিদ্রোহ বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলন বিনাশ বিদ্রোহের অঙ্গসংগঠন। এপ্রিলের ৬ তারিখে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভে কালমাসের সঙ্গের তিন বন্ধু হলেন পদার্থবিদ গ্রেগ স্পুনার, প্রকৌশলী এরিক গিল ও বন্যপ্রাণী শিক্ষক অ্যালান চরনাক।
ইকুয়েডরের রাজধানী কিটোর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সামনে সেদিন বিক্ষোভ করেন লাতিন বিজ্ঞানীরা। বিক্ষোভ হয় ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনেও। রুয়ান্ডা, সিয়েরা লিওন, কলম্বিয়া, মালাউই, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অহিংস আন্দোলনে অংশ নেন হাজারখানেক বিজ্ঞানী। জলবায়ু কর্মীদের সম্পর্কে একবার জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, ‘জলবায়ু নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের কখনো কখনো বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আমি মনে করি, সত্যিকার অর্থে বিপজ্জনক তারাই যারা জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়াচ্ছে, কমাচ্ছে না।’
কালমাসের অবস্থান
১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক করেন কালমাস। এরপর ২০০৮ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে পিএইচডি করেন তিনি। ২০১৭ সালে বিয়িং দ্য চেঞ্জ : লিভ ওয়েল অ্যান্ড স্পার্ক এ ক্লাইমেট রেভ্যুলুশন নামে একটি বই লেখেন কালমাস। লস অ্যাঞ্জেলেসে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংক থেকে গ্রেপ্তারের পরদিন দ্য গার্ডিয়ানে মতামত লেখেন তিনি। সেখানে কালমাস বলেন, ‘এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) প্রতিবেদনে বিশ্ব কোনোদিকে যাচ্ছে ও আমাদের কী করা প্রয়োজন এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক চোখে পড়ে আমাদের। প্রতিবেদনটি পড়ে আমরা বিজ্ঞানীরা বিশ্বজুড়ে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিই। জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংককে বিক্ষোভস্থল হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ বিশ্বে যতগুলো ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ওই ব্যাংক সবচেয়ে বেশি নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়ন করে। আইপিসিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো থেকে দ্বিগুণ গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে। বিশ্ব এই পরিমাণে উষ্ণ হলে মানবসভ্যতা এক দিন ধ্বংস হয়ে যাবে, এ বিষয়ে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা নৈতিক ও অর্থনৈতিক পাগলামি ছাড়া কিছু নয়। শুধু জাতিসংঘের মহাসচিব নন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন আরও অনেকে বহুবার পৃথিবীর মঙ্গলের স্বার্থে বিশ্বনেতাদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অনেক নেতা, বড় বড় ব্যাংক কারও কথা শুনছে না। এটি বললে অত্যুক্তি হবে না, জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়নের মধ্য দিয়ে গণহত্যায় অবদান রাখছে। পৃথিবীর অবস্থা কতটা ভয়াবহ, তা মানুষ এখনো সেভাবে বুঝতে পারছে না। বিজ্ঞান বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানি আমাদের গ্রহকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করছে। আমরা যা কিছু ভালোবাসি, সবকিছু এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জলবায়ু বিপর্যয়ের পাশাপাশি অবস্থান। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফার স্বার্থে আমরা শুধু বর্তমান বিপর্যয়ের সাক্ষী না, একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও কত ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে পৃথিবীর মানুষ, তাও বুঝতে পারছি। মাঝেমধ্যে আমি জলবায়ু নিয়ে পড়াশোনা প্রথম থেকে শুরু করি, এটা দেখার জন্য যে, যা ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে, সেসব সত্যি কি না। প্রতিবারই হতাশ হই। বিজ্ঞান ও বাস্তবতা আমাকে কল্পনার রাজ্য থেকে বের করে আনে। আমরা বিজ্ঞানীরা যা দেখছি, তা যদি সবাই দেখতে পেত, তাহলে জরুরি অবস্থায় চলে যেত বিশ্ব এবং কয়েক বছরের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বাতিল করে দেওয়া হতো।’
কালমাস বলেন, ‘গ্রিক পুরাণে ক্যাসান্ড্রা নামে এক চরিত্র রয়েছে। তিনি ট্রয়ের রাজা প্রাইয়ামের মেয়ে। ক্যাসান্ড্রার রূপে মুগ্ধ হয়ে গ্রিক দেবতা অ্যাপোলো একবার তাকে একটি পুরস্কার দেন এবং তা হচ্ছে ক্যাসান্ড্রার ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা। ক্যাসান্ড্রা অবশ্য অ্যাপোলোর প্রেমে শেষ পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অভিশাপ দেন অ্যাপোলো। অভিশপ্ত ক্যাসান্ড্রা তখন যতই ভবিষ্যদ্বাণী করুক না কেন, তার কথা কেউই বিশ্বাস করত না। আমি ক্যাসান্ড্রা হতে চাই না। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে জীবনের বাকিটা সময় কাটাতে চাই ও বিজ্ঞানচর্চা করে যেতে চাই। তবে জলবায়ু পরিবর্তন আমাকে উদ্বিগ্ন হতে বাধ্য করেছে। জলবায়ুর বর্তমান পরিস্থিতি দেখেও বিশ্ব নেতাদের হুঁশ ফিরছে না। তাই তাদের ও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কিছু একটা করার প্রয়োজন বোধ করি। আমাদের জলবায়ু আন্দোলন আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রায়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। একের পর এক বন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাওয়া আমাকে আহত করে। জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ চলতেই থাকবে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পৃথিবী বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের লড়াইও চলবে। জননেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে দাঁড়ায় না, সে আসলে একে সমর্থনই করে।’