গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) স্থাপন করা হয়েছে দেশের প্রথম ‘রাইস মিউজিয়াম’ (ধান জাদুঘর)। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের দর্শনার্থী, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা এই জাদুঘরে এসে ধান সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে যাচ্ছেন। দেশে উদ্ভাবিত ধানের বিভিন্ন জাতও দেখতে পারছেন তারা।
রাইস মিউজিয়ামটিতে সনাতন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে ধান রোপণ, মাড়াই ও কর্তন পর্যন্ত যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হতো ও হচ্ছে, তা প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। ২০১৮ সালে এই রাইস মিউজিয়াম স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ার পর উদ্বোধন করা হয় চলতি বছরের ১২ মার্চ। এটি দেশের একমাত্র ও প্রথম রাইস মিউজিয়াম।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার এবং রাইস মিউজিয়ামের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন জানান, ব্রি উদ্ভাবিত ধানের নতুন জাত ও প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণে একটি নলেজ হাব তৈরি এবং ধানবিষয়ক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে দেশি-বিদেশি পরিদর্শকদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে রাইস মিউজিয়াম। ব্রি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি প্রদর্শনীর জন্য ১৫টি সেলফ স্থাপন করা হয়েছে। জাত ও প্রযুক্তিগুলোর নমুনা এবং রেপ্লিকা রাখা হয়েছে সেখানে। মিউজিয়ামের ডিসপ্লে সেলফে নতুন ও পুরনো বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতিও রাখা হয়েছে; যা দেখে দেশি-বিদেশি পরিদর্শকরা উদ্বুদ্ধ হবেন। এই জাদুঘরে ধান রোপণ থেকে চাল হিসেবে কৃষকের ঘরে তোলা পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া ছবির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতি বছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটক, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষকরা ব্রি পরিদর্শনে আসেন। তারা রাইস মিউজিয়ামে এসে ধানবিষয়ক ইতিহাস, ঐতিহ্য, ব্রির গবেষণা ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তি এবং ব্রির অগ্রগতির ইতিহাস ও সার্বিক কর্মকাণ্ড এক নজরে দেখতে পারবেন।
ব্রির কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের ধান গবেষণার অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধানভিত্তিক আচার অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি এবং খাদ্যনিরাপত্তায় ব্রি তথা বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সুন্দর ও ফলপ্রসূভাবে তুলে ধরার জন্য ব্রিতে একটি অত্যাধুনিক রাইস মিউজিয়াম স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। যার মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তায় আমাদের অসামান্য অগ্রগতি এবং ধানসংক্রান্ত অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য এক ছাদের নিচে এনে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা সহজ হবে। মিউজিয়ামটি ধানবিষয়ক ইতিহাস ঐতিহ্য, ব্রির গবেষণা-উদ্ভাবিত প্রযুক্তি এবং ব্রির অগ্রগতির ইতিহাস ও সার্বিক কর্মকাণ্ডের প্রদর্শনী হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য সহায়ক হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ইতিপূর্বে কোনো সুসজ্জিত রাইস মিউজিয়াম না থাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ব্রি পরিদর্শনে এসে হতাশ হতেন।’
ব্রির মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধানকে এ দেশের জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খাদ্যনিরাপত্তা বলতে এ দেশে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ভাতের নিরাপত্তাকেই বোঝানো হয়। কোনো দেশের শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় খাদ্যনিরাপত্তা দিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বমানের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সাড়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্রি দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। বন্যা, খরা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধান, শীতপ্রধান অঞ্চলের উপযোগী ধান, সরু ও সুগন্ধি প্রিমিয়াম কোয়ালিটি ধান, জিংকসমৃদ্ধ ধান (বিশ্বের প্রথম) ও হাইব্রিড ধানসহ ৯৯টি ইনব্রিড ও ৭টি হাইব্রিড মিলিয়ে মোট ১০৬টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। আন্তর্জাতিক মানের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিতে একটি সুসজ্জিত রাইস মিউজিয়াম স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল।’