সুইস ব্যাংকে জমা টাকার তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের বিষয়ে জানতে সুইস অথরিটির কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গতকাল শনিবার এক সেমিনারে এ কথা জানিয়েছেন বিএফআইইউর অতিরিক্ত পরিচালক মো. কামাল হোসেন।

‘বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিএফআইইউর ২০ বছর’ শীর্ষক ওই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কুড়িলসংলগ্ন বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে (আইসিসিবি)।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থের বিষয়ে ২০১৪ সাল থেকে তথ্য প্রকাশ করে আসছে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক উপস্থাপনায় কামাল হোসেন বলেন, সুইস অথরিটির কাছে প্রতিবারের মতো এবারও তথ্য চাওয়া হয়েছে বিএফআইইউর পক্ষ থেকে। পাচার করা অর্থ উদ্ধার জটিল কাজ। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের ৬৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছ থেকে।

সেই তথ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সেমিনারে জানানো হয়, এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৮০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করেছে বিএফআইইউ।

বাংলাদেশ থেকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, হংকং, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের দেশগুলোতে অর্থ পাচার হয় বলে সেমিনারে জানানো হয়।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত তদন্তাধীন ৯টি মামলার বিপরীতে ৮৬৬ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বিএফআইইউর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে। সরকারের কোষাগারে জমা পড়েছে ২৭ কোটি টাকা।

এর আগের অর্থবছরে ৭ মামলার বিপরীতে ৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয় আদালতের নির্দেশে। গত পাঁচ বছরে ৬৩টি তদন্তাধীন মামলার বিপরীতে ১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর মধ্যে সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে ১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা।

বিএফআইইউর প্রধান কর্মকর্তা মাসুদ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ।

সেমিনারে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘কভিড আক্রান্ত হয়ে ১৮৯ জন ব্যাংক কর্মকর্তা মারা গেছেন। কভিডের সময় আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যাংক খোলা রেখেছি। এই মুহূর্তে ব্যাংক খাতের বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি। ডলারের বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে আমাদের রিজার্ভে আছে ৪ হাজার ১৫০ কোটি ডলার। তিন মাসের আমদানি ব্যয় বাবদ আমাদের দরকার ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এ ছাড়া আপৎকালীন খাদ্য আমদানির জন্য আরও ৪০০ কোটি ডলার রাখলে মোট রিজার্ভ দরকার ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। সেই হিসেবে আমাদের রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক অবস্থানে (কমফোর্ট জোন) আছে। কিন্তু তারপরও আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এই চাপ বেশি না বাড়ে।’

২০০২ সালে যাত্রা শুরু করে বিএফআইইউ। এ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের উদ্দেশে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশে মুদ্রা পাচারের পরে সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো ওই অর্থ সন্ত্রাসে অর্থায়নে যাতে চলে না আসে। সরকার সন্ত্রাসে অর্থায়নে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে কমপ্লায়েন্স থাকার জন্য যে খরচ হয় তা না করলে যেসব ঘটনা ঘটবে তার জন্য আপনাদের আরও বেশি খরচ করতে হবে। আপনাদের যার যার অবস্থান থেকে এটা লক্ষ রাখবেন।

ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ফজলে কবির আরও বলেন, ‘আপনারা যদি নিজেদের ব্যাংকে মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া নির্দেশনা না পরিপালন করেন, তাহলে আপনাদের ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। অতীতে দেখা গেছে, দেশে যখনই কোনো সংকট আসে, অপরাধীরা তখন আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। যাকে বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা। এ কারণে সংকটের সময় আপনারা বেশি বেশি নজরদারি করবেন ব্যাংকের নীতিমালা পরিপালনের ক্ষেত্রে।’