চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মৃত্যুর বিয়োগান্তক ঘটনা যেন এক ললাট লিখন হয়ে গেছে। পাহাড় কেটে প্রকৃতি ধ্বংসের পরিণতিতে প্রতি বছর মাটিচাপায় মৃত্যুর মিছিল দেখছে চট্টগ্রামবাসী।
বন-পাহাড় ও নদী-সমুদ্র বেষ্টিত চট্টগ্রামের অনন্য প্রাকৃতিক রূপ সুষমা এবং বৈশিষ্ট্য আজ হারিয়ে গেছে নির্বিচার পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী ভরাট, অবৈধ দখলদারিত্ব ও সমুদ্র দূষণে। ফলে বর্ষায় হালকা কিংবা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম শহরের দুই-তৃতীয়াংশ তলিয়ে যাচ্ছে জলাবদ্ধতায়। ঘটছে পাহাড় ধস, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল মিলেনি গত তিন বছরেও। মানুষের ভুল ও লালসার সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণের এ এক নির্মম পরিহাস। এর যেন কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।
গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবারের বৃষ্টিতে হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে বহদ্দারহাট, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, মুরাদপুর, ষোলশহর, অক্সিজেন, জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকা। ফয়’স লেক আকবর শাহ থানা এলাকায় গতকাল পাহাড় ধসে মারা গেছে অন্তত ৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ জন। প্রায় প্রতি বছরই চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে বা পাহাড়ে খাঁজ কেটে বসবাসকারী বস্তিবাসী বা নিম্ন আয়ের লোকজনের বেঘোরে মৃত্যু ঘটছে। চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড় ধসে অনুরূপ মৃত্যুর ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১১ জুন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ পাহাড় ধসে ১২৭ জন শিশু-নারী-পুরুষের মৃত্যু ঘটে। সেই থেকে গত ১৫ বছরে বর্ষায় পাহাড় ধসে বৃহত্তর চট্টগ্রামে শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। শুধুমাত্র চট্টগ্রামেই মারা গেছে অন্তত আড়াইশ জন। ২০০৭ সালের ভয়াবহতার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। জননিরাপত্তা, পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের উচ্ছেদ, পাহাড় কাটা রোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে এই কমিটি গত প্রায় ১৫ বছর ২১টি সভা করেছে বলে জানা গেছে এবং ৩৬ দফা সুপারিশ পেশ করেছে। কিন্তু এ যাবৎ কোনো সুপারিশই কার্যকর কিংবা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাহাড় ধসের বিষয়টি নিয়ে আমরা সারা বছরই কাজ করছি। পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও তারা সেখানে আছে।’ তবে এবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
বারবার পাহাড় ধসে প্রাণহানি প্রসঙ্গে পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমন্বয়হীনতার কারণে বারবার পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে আমলারা যদি পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কার্যকরী উদ্যোগ নিত, তাহলে এত প্রাণহানি হতো না। জবাবদিহি থাকলে কখনো এটা ঘটত না। না হলে ২০০৭ সালে প্রণীত সুপারিশমালা ১৫ বছরেও কেন বাস্তবায়ন হলো না। বারবার উচ্ছেদ করার পর আবারো কেমনে তারা পাহাড়ে বসতি গড়ে তোলে? কেটে দেওয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ তারা কীভাবে পায়?’ তিনি বলেন, ‘মূলত স্থানীয় রাজনীতিক ও পাহাড় খেকোদের সঙ্গে আমলাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র আছে। তাই এই সংকট কাটিয়ে উঠা যাচ্ছে না।’
ড. ইদ্রিস আলী আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার বাস্তুচ্যুত লোকজনকে যদি জায়গা দিতে পারে, তাহলে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা লোকদের পুনর্বাসন করা কোনো ব্যাপারই না। সমন্বয়হীনতার কারণেই এই সংকট মোকাবেলা করা যাচ্ছে না। সবাইকে একসঙ্গে করা না গেলে প্রয়োজনে এ, বি, সি ক্যাটাগরি করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের পুনর্বাসন করা হোক। যাদের একেবারেই কোনো ভিটেবাড়ি নেই তাদের এ ক্যাটাগরিতে রেখে বাকিদের পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন করতে পারে।’
চট্টগ্রাম শহর অভ্যন্তরে ফিরোজ শাহ, আকবর শাহ, পাহাড়তলি, আমবাগান, ঝাউতলা, ফয়’স লেক, কৈবল্যধাম, শেরশাহ, মাতঝর্ণা, লালখান বাজার, পোড়া কলোনি, বাঘঘোনা, বাটালি হিল, জঙ্গল সলিমপুর, পলিটেকনিক সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা, আমিন জুট মিল কলোনি, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, টাংকির পাহাড়সহ অন্তত ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অবৈধভাবে বসবাসকারী বাসিন্দার সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার বা আরো বেশি। এসব পাহাড়ের বেশির ভাগ সরকারি। যার কোনো বন্দোবস্ত নেই। পাহাড় কেটে কিংবা পাহাড়ের ঢালে বা পাদদেশে গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তি বা কলোনিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা। এরাই সেখানে কাঁচা ঘর তৈরি করে ভাড়া আদায় করে। জেলা প্রশাসন কখনো কখনো অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করলেও পরবর্তীতে আবার অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে যায়।