আগামী ২৫ জুন সরকার পদ্মা সেতু উদ্বোধন করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতু বন্যার এই প্রেক্ষাপটে সহজ যোগাযোগের ক্ষেত্রে জাতির জন্য একটি আশীর্বাদ হবে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল রবিবার সকালে তার কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনা ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সম্মাননার চেক বিতরণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দেশে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এবার বন্যাটা একটু বড় আকারে আসবে এমন আশঙ্কার কথা সরকারের সবাইকে আগেই জানিয়েছি। কাজেই সেভাবে আগে থেকে আমাদের প্রস্তুতি আছে। বন্যায় মানুষের যাতে করে কষ্ট না হয়, সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।’
বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি, পদ্মা সেতু এমন একটা সময় উদ্বোধন করতে যাচ্ছি, যে সময় বন্যা শুরু হয়ে গেছে। এই বন্যা কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলেও যাবে। সে সময় পণ্য পরিবহন, বন্যা মোকাবিলা, বন্যার সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সহযোগিতা করার একটা বিরাট সুযোগ আমাদের আসবে। বন্যার্তদের রিলিফ দেওয়া থেকে ওষুধ সরবরাহ এবং খাদ্য সরবরাহের বিষয়টি আরও সহজতর হবে।’
১৯৮৮ সালের বন্যায় গোপালগঞ্জে আটকা পড়ার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, তখন এ রকম পদ্মা সেতু থাকলে সহজেই চলে আসা সম্ভব হতো। তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের সব থেকে ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ঠিক সেই বন্যার আগেই আমরা যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু উদ্বোধন করেছিলাম। আর সেটা করেছিলাম বলেই উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য পরিবহনসহ সব কাজের সুবিধা হয়।’
সরকারপ্রধান বলেন, বন্যায় নদীগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠলে প্লাবিত দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকার উত্তরাঞ্চল থেকে সুবিধাটা পায়। যার ফলে বন্যা সফলভাবে মোকাবিলা সম্ভব হয়। সেই সময় বিবিসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রচার ছিল, সে বন্যায় প্রায় দুই কোটি লোক না খেতে পেয়ে মারা যাবে। কিন্তু তার সরকার বলেছিল, ‘একজন মানুষকেও তার সরকার না খেয়ে মরতে দেবে না’ এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল। আর এই কাজে সেই সেতুটা তখন বিরাট কাজে এসেছিল।
খেলাধুলাকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দেশে বিশ^মানের ক্রীড়াবিদ তৈরিতে তার সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বন্যাও আমরা মোকাবিলা করব এবং খেলাধুলাও আমাদের চলবে, সবই আমাদের চলবে। এটাই আমাদের জীবন, এটাকেই মেনে নিতে হবে। এটাই বাস্তব এবং বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই আমাদের চলতে হবে এবং বিশ^সভায় আমরা মাথা উঁচু করেই চলব।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাফ-২০২১ চ্যাম্পিয়ন মহিলা অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় ফুটবল দলের ৩৩ জন সদস্যসহ ৮৮ জন ক্রীড়াবিদকে আর্থিক সম্মাননা দেওয়া হয়। অপর ৫৫ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে মুজিববর্ষ ফিফা আন্তর্জাতিক ফুটবল সিরিজ ২০২০-এর ৩৩ জন এবং বঙ্গবন্ধু ৪-জাতি ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০২২-এর বিজয়ী ২২ জন খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সাফ-২০২১ চ্যাম্পিয়ন মহিলা অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন মারিয়া মান্দা, খেলোয়াড় মনিকা চাকমা এবং প্রধান প্রশিক্ষক গোলাম রব্বানী ছোটন, বাংলাদেশ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন ফয়সাল খান এবং বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন জামাল ভূঁইয়ার হাতে আর্থিক সম্মানীর চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তিন শ্রেণির ক্রীড়া দলের ওপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি (বাফুফে) কাজী মো. সালাউদ্দিন, মহিলা অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দা এবং বাংলাদেশ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ফয়সাল খান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম।
সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির প্রতিনিয়ত খবর রাখছেন এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একদিকে যেমন করোনার প্রাদুর্ভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপরদিকে সিলেট এবং সুনামগঞ্জে ব্যাপক বন্যা হয়েছে। এবারের বন্যাটা একটু বেশিই ব্যাপক হারে এসেছে।
বন্যায় ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চলমান রয়েছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠান বন্যার্ত মানুষকে উদ্ধার করা, তাদের ত্রাণ দেওয়া থেকে শুরু করে সব সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ প্রতিটি সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন এলাকায় সহযোগিতা করছেন। খাবার বিতরণ থেকে শুরু করে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, এর পাশাপাশি স্যালাইন, সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ যা যা দরকার হতে পারে তার জন্য প্রস্তুতিও সরকার নিয়েছে।
পানি নামার সময় দেশের দক্ষিণাঞ্চল প্লাবিত হয়ে যায়, দেশের বন্যার এই চিত্র ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুনামগঞ্জ থেকে এই পানি আজ একটু নামতে শুরু করেছে। কিন্তু পানি যখন নামবে, তখন অন্যান্য অঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করবে। এটা আমাদের প্রাকৃতিক নিয়ম। কাজেই আমাদের, বিশেষ করে ময়মনসিংহ বিভাগ, রংপুর বিভাগেও বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা আগে থেকেই সতর্কতা আমরা নিচ্ছি এবং সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। পানি নিষ্কাশনের জন্য যা যা করণীয় আমরা সেটাও করে যাচ্ছি।’
সিলেট-সুনামগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যার কারণে সারা দেশের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করার কথাও উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।
কাল সিলেট যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল মঙ্গলবার সিলেটের বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সিলেট যাবেন তা জানি। তবে এখনো সময় চূড়ান্ত হয়নি।’
এদিকে সচিবালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান আজ সোমবার সিলেট যাচ্ছেন। তিনি সেখানে মঙ্গলবারও অবস্থান করবেন।
গতকাল সিলেটে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী দুর্গত মানুষের সহায়তায় যা কিছু করা সম্ভব তা করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, সাভারসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের সেনাসদস্যদের বন্যাকবলিতদের সহায়তায় নিয়োজিত করা হয়েছে। আরও অনেককে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে।
এদিকে রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।