দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে ৪০ লাখের বেশি মানুষ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রম শেষ হতে যাচ্ছে আজ। তবে বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের কাছে পৌঁছতে না পারার কারণে শঙ্কায় পড়েছে সপ্তাহব্যাপী এ কার্যক্রম।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যতটুকু পারা যায় কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষকে বিরক্ত না করে, সীমার মধ্যে থেকে শুমারির কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ওইসব এলাকায় শুমারির কাজ সম্পন্ন না হলে করণীয় বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় ডুবেছে সিলেট বিভাগের বেশিরভাগ অঞ্চল। টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুরমা আর কুশিয়ারার কূল উপচে সিলেট আর সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৯০ শতাংশেরও বেশি প্লাবিত সুনামগঞ্জের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে সারা দেশের যোগাযোগ। এছাড়া উত্তরের কয়েকটি জেলায়ও দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। তথ্যমতে, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বর ও কংস নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হয়েছে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, শেরপর, নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা।
এসব এলাকায় চলমান জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রম চলবে কি না সে ঝুঁকিতে রয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো সারা দেশে একযোগে ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল শুমারি হচ্ছে। ট্যাবের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। অথচ সিলেট উপশহরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে জনশুমারির কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বন্যাকবলিত এলাকায় জনশুমারির কার্যক্রমের ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিকল্পনা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু সামাল দিয়ে গণনা করা যায়, গণনা করছি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত। পর্যবেক্ষণে দেখেছি শুধু সুনামগঞ্জ ছাড়া বাকি এলাকাগুলোতে খুব বেশি ডিফিকাল্ট হচ্ছে না। সুনামগঞ্জটাই একটু ভার্নারেবল হয়ে যাচ্ছে। আমরা আবহাওয়াটা আরেকটু দেখি। অগ্রগতি একেবারেই খারাপ নয়। যথেষ্ট ভালো। বন্যা পরিস্থিতি অবশ্যই মানবিক ব্যাপার। আমরা মানুষকে কষ্ট না দিয়ে, অসুবিধা না করে, আমাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও বাড়িয়ে যতটুকু পারছি করার চেষ্টা করছি।’
পানিবন্দি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিপদে আছে শিশু ও বয়স্করা। আটকে পড়াদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে। যেখানেই শুকনো ও উঁচু জায়গা পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই আশ্রয় নিচ্ছে মানুষ। সিলেটের সবকটি উপজেলা ও অর্ধেক শহর, সুনামগঞ্জের উপজেলা ও পৌর শহর বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক ও সিলেট-ভোলাগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক। দুই জেলায় শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সিলেটের অন্যতম বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র কুমারগাঁও স্টেশনে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে গেছে সিলেটের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। সুনামগঞ্জে গত দুদিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
গত রবিবার মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব জানায়, বিদ্যুতের অভাবে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনার ৪৫ শতাংশ মোবাইল টাওয়ার (বিটিএস) অচল হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎহীন পরিস্থিতিতে ট্যাবের কার্যক্রম নিয়ে শাহনাজ আরেফিন বলেন, ‘আমরা ডিফেন্স সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। সেখানে আমাদের ট্যাবগুলো চার্জে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। গণনাকারীরা এগোচ্ছেন, চার্জ হচ্ছে আবার মাঠে নেমে পড়ছেন। তবে এটা সত্য যে, যতটা গতিশীল হওয়ার কথা আমরা এরকম আবহাওয়ায় ততটা গতিশীল হতে পারছি না। কিন্তু আমরা কাজও বন্ধ করিনি। আমি সেখানকার জেলা প্রশাসনের সাহায্য পাচ্ছি। অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের সাহায্য পাচ্ছি। আমরা সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছি, মানুষকে কষ্ট না দিয়ে যাতে কাজ এগিয়ে নেয়।’
দেশের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা সমন্বিত করার জন্য ১৫ জুন থেকে জনশুমারি শুরু হয়েছে। জনশুমারির তথ্য সংগ্রহ কাজে শুমারিকর্মী হিসেবে ৩ লাখ ৭০ হাজার গণনাকারী ও ৬৪ হাজার সুপারভাইজার নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে ১২ শুমারি বিভাগের সমন্বয়কারী হিসেবে ১২ জন উপসচিব এবং কেন্দ্রীয় জনশুমারি নিয়ন্ত্রণ সেলের জন্য ৩ জন যুগ্ম সচিবকে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে ন্যস্ত করা হয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২ থেকে ৮ জানুয়ারি জনশুমারি করার কথা ছিল, যা করোনার কারণে পিছিয়ে যায়। পরে ২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর করার সিদ্ধান্ত হয়। ট্যাব জটিলতায় তা শুরু করা যায়নি। ট্যাব কেনার জটিলতার পর ২৪ থেকে ৩০ ডিসেম্বর শুমারি সপ্তাহ ধরে জনগণনা করার কথা ছিল, কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি।