শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় ডুবে থাকা সিলেট ও সুনামগঞ্জের লাখ লাখ মানুষ জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভয়াবহ বন্যার পঞ্চম দিন গতকাল সোমবার সিলেট নগরী ও জেলার কিছু কিছু এলাকায় পানি সামান্য কমলেও মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট ঘরে ঘরে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষও একই সংকটে। অনাহারে-অর্ধাহারে ও বন্যার দূষিত পানি পান করে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পেটের পীড়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। ত্রাণের আশায় মানুষ কাঙালের মতো পথ চেয়ে আছে। বানভাসি এসব মানুষের চোখে-মুখে বাঁচার আকুতি। যদিও প্রশাসন ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাদ্যসামগ্রী, পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি, বোতলজাত পানি বিতরণ করা হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। জলযানের অভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, বিজিবি, প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার তৎপরতা ও খাবার বিতরণ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনও বলছে, ভয়াবহ এই বন্যায় যে সংকট চলছে, তা মোকাবিলা সত্যিই অনেক কঠিন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ ছাড়া সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকতে পারে। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর জুন মাসজুড়ে যে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে তাতে করে পরবর্তী সময় কী হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
একটানা তিন দিন বৃষ্টিপাতের পর গতকাল সিলেটে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। ভোরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও দিনের বেলা বৃষ্টি হয়নি। তবে সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় ফের অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিল। বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় সিলেট নগরীর কিছু এলাকায় এবং নদ-নদীর পানিও কিছুটা কমেছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সোমবার সকালে সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও তা এখনো বিপদসীমার ওপরেই। এ ছাড়া কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীর পানিও এখন বিপদসীমার ওপরে।
সিলেটের সদর উপজেলা, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি আগের মতো ভয়াবহরূপেই আছে। সিলেটের ভারত সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার মানুষ রয়েছে সবচেয়ে বেশি বিপদে। বন্যা দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় বিপর্যয় আরও বাড়ছে। জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই উপজেলার অর্ধেকের বেশি মানুষের বাড়িঘর এখন পানির নিচে। চরম ভোগান্তিতে আছে তারা। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আবার অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রত্যেকেই আছে খাবারের সংকটে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে আরও প্রচুর ত্রাণের চাহিদা রয়েছে।
জৈন্তাপুরের বালিপাড়া, হেমু, ভাটপাড়া, মাঝপাড়া, দত্তপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে হরিপুর উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে। সেখানে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুও গাদাগাদি করে থাকছে। ওই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নূর মিয়া বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আছি। অনেকটা না খেয়েই আমাদের থাকতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু খাবার এলেও তা দিয়ে পেট ভরছে না। আবার কোনো সময় একেবারেই না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কেন্দ্রে কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান। একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নেওয়ারুন নেছা নামের এক নারী জানান, তার ঘরে কোমরসমান পানি। পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন। আর ছেলে বাড়িতে পানির মধ্যেই থেকে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। বাড়িতে যেমন খাবার নেই, আশ্রয়কেন্দ্রে এসেও উপোস থাকতে হচ্ছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার থানাবাজার, তেলিখাল এলাকায় শত শত মানুষ ত্রাণের অপেক্ষায় সড়কে অবস্থান করছে। গতকাল বিকেলে স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ী তোফাজ্জল মিয়া দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বেশিরভাগ মানুষ পাথর কোয়ারি ও পাথরভাঙার মিলে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। তারা দিন এনে দিন খান। ঘরে তাদের কোনো সঞ্চয় থাকে না। বন্যায় তারা কাজ হারিয়েছেন, ঘর পানিতে ভেসে গেছে। এই মানুষগুলো এখন জীবন বাঁচাতে ত্রাণের জন্য এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন, যদি কোনো খাবার পাওয়া যায় এই আশায়।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনাঘাট ও জৈন্তাপুরের মানুষ বন্যায় বেশি বিপন্ন। এই তিন উপজেলায় পানিবন্দি অবস্থায় সংকটাপন্ন লোকজনকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। আর সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনগুলো সাধ্যমতো খাবার বিতরণ করে যাচ্ছে।
সিলেটের মতো একই অবস্থা সুনামগঞ্জেরও। সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হয়েছে। এই জেলার প্রায় ৯০ ভাগ এলাকা বন্যায় প্লাবিত। ঘরে পানি, বাইরে পানি, চারদিকে পানি আর পানি। কিন্তু খাবারের জন্য পানি পাচ্ছে না বানভাসি মানুষ। আছে খাবারের তীব্র সংকট। মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিও বন্যায় ভয়ানক বিপদে। গতকাল থেকে পানি কিছু নামতে শুরু করলেও জেলার বিভিন্ন এলাকা এখনো দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে। এখনো দোকানপাট, অফিস-আদালত ভবন সর্বত্রই পানি। রাস্তাঘাট সবই পানিতে তলিয়ে গেছে। নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো সুযোগ নেই। হাজার হাজার মানুষ যেসব বাড়িতে দোতলা বা তার চেয়ে বেশি উঁচু ঘর, স্কুল, কলেজ। মসজিদ, অফিস-আদালত, নির্মাণাধীন বাড়ি ঘর, ঘরের সিঁড়ি, বাসাবাড়ির ছাদে, সেতুর ওপর আশ্রয় নিয়েছে। খেয়ে না খেয়ে কাটাচ্ছে মানুষ। খাবার, বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। মোমবাতিও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ ইচ্ছে করলেও জিনিসপত্র কিনতে পারছে না। মানুষের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খাবারের। শহরের প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, এটি সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা। এত পানি, পাহাড়ি ঢল আগে কখনো দেখেননি তারা। বন্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে রয়েছে। বন্যাকবলিতদের সহায়তায় সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করি বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হবে। জেলায় এখনো ৪৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষজন আছে। ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৮০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।’
সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি নতুন করে অবনতি না হলেও বিভাগের হবিগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার চার উপজেলায় ৩৪টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। খোয়াই নদীর পানি সীমান্ত সংলগ্ন বাল্লা পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪৭ সেন্টিমিটার এবং হবিগঞ্জ সদরে মাছুলিয়া পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। যেকোনো সময় শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে যেতে পারেÑ এ আশঙ্কায় শহরবাসীকে সতর্ক থাকার জন্য মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে কুশিয়ারা নদীর পানিও বেড়ে যাওয়ায় নবীগঞ্জ ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
নবীগঞ্জ উপজেলার ৯টি, লাখাই উপজেলায় ৪টি, বানিয়াচঙ্গ উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন এবং আজমিরিগঞ্জ পৌর এলাকাসহ ৫টি ইউনিয়ন এখন বন্যার কবলে। এদিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লুকড়া নামক স্থানে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে পানি হবিগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করছে।
গতকাল লাখাই উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, বাড়িঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করায় লোকজন তাদের জানমাল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত ওই চার উপজেলার ১৫ হাজার ২০০ পরিবারের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দ্বিগুণ। জেলায় বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৩৫ টন চাল, ৫ লাখ টাকা, ২ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট পাঠানো হয়েছে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে টানা কয়েক দিনের বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খরস্রোতা ধলাই নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রবিবার রাতে প্রতিরক্ষা বাঁধের ৭টি স্থানে ফাটল ও মাটি ধস দেখা দিয়েছে। এতে আতঙ্কিত গ্রামবাসী রাত জেগে স্বেচ্ছাশ্রমে গাছ ও মাটিভর্তি বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছে। অপরদিকে পাহাড়ি ঢলের পানিতে রবিবার রাতে উপজেলার পতনঊষার এলাকায় লাঘাটা ছড়ার বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে দুই গ্রামের প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত না করায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
ধলাই নদীর ১১টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ স্বীকার করে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত বাঁধগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধলাই নদীর বাঁধ মেরামতে বড় ধরনের একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এখানে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই।’
সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহম্মদ মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিলেট ও সুনামগঞ্জে এবার যে বন্যা হয়েছে, এমনটি গত একশ বছরেও হয়নি। এটা খুবই কঠিন অবস্থা। এমন ভয়াল অবস্থার সৃষ্টি হবে তা কারও চিন্তায় ছিল না। ফলে দুই জেলার লাখ লাখ দুর্গত মানুষকে উদ্ধার ও তাদের পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তা দেওয়া কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই এ ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে সবাই কাজ করে যাচ্ছেন।