নেত্রকোনা কলমাকান্দা উপজেলা সদরের মুদি দোকানি প্রবাল দাসের বাড়ির আশপাশে বন্যার পানি। পানি ঢুকেছে ঘরেও। ডুবেছে দোকানের মালামালও। বন্যা শুরুর পর বাড়ি আর দোকান সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাকে। এর মধ্যে দুদিন আগে স্ত্রী শিখা দাসের ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। তাকে স্যালাইন খাওয়ান। কিন্তু দোকানের চাপ আর পানির জন্য স্ত্রীকে নিতে পারেননি হাসপাতালে। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও ডুবেছে পানিতে। এর মধ্যে বুধবার সকালে তার অবস্থার কিছু উন্নতিও হয়। তবে রাত থেকেই অবস্থা খারাপ হতে শুরু। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শিখা। প্রবাল-শিখা দম্পতির ৫ বছর বয়সী ছেলে উৎস চেয়ে চেয়ে দেখেছে মায়ের মৃত্যু।
উৎসবের মতো অনেকেই এ বন্যায় স্বজন হারিয়েছে। অনেকে ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, চর্মরোগসহ নানা ধরনের পানিবাহিত ব্যাধিতে ভুগছেন। তবে এখন বানের পানি পুরো না নামায় ও পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে এখন চরম সংকটে পড়েছেন বানভাসি মানুষেরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, দেশের ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রংপুর ও সিলেট বিভাগের ১৮৫টি উপজেলার মধ্যে ৬৫টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। বন্যাদুর্গত এসব স্থানে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব উপজেলায় পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৪৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, বন্যা শুরুর পর থেকে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ৪ হাজার ৪৮ জনের মধ্যে ডায়রিয়ায় ২ হাজার ৮৯৫ জন, শ্বাসনালির প্রদাহজনিত রোগ রেসপেরেটরি ট্রাক ইনফেকশনে (আরটিআই) ১১৮ জন, চর্মরোগে ১৯৫ জন, চোখের প্রদাহে ৭৫ জন, অন্যান্য আঘাতে ৬৪ জন। এ ছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪০ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭৯ জন, চর্মরোগে ২০ জন, চোখের প্রদাহে ১৫ জন, অন্যান্যভাবে আঘাত পেয়েছেন ২৫ জন এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫৯ জন। এ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩৫ জন।
অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বন্যাদুর্গত ৬৫ উপজেলার ৪২১টি ইউনিয়নে ২ হাজার ৬টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। মিলছে না চিকিৎসা-ওষুধ টিমের সদস্যরা বন্যার সময় রোগাক্রান্ত মানুষের সেবা দিতে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বন্যাদুর্গতরা বলছেন, তারা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাচ্ছেন না। আর যেখানে কোনো চিকিৎসা ক্যাম্প করা হয়েছে সেখানে ভিড় করছেন দুর্গতরা। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের অবস্থা খুবই করুন। গতকাল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে দেখা গেছে, বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক এলাকায় বন্যার্ত শত শত মানুষ চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য ভিড় করছেন। পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, সর্দি-কাশি, মাথাব্যথা ও কাটাছেঁড়ার মতো জটিলতা নিয়ে তারা চিকিৎসার জন্য এসেছেন।
গতকাল বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে সেখানে তিনটি বুথ করা হয়েছে। একটিতে চিকিৎসা নিতে আসা বন্যার্ত মানুষদের নিবন্ধন করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বুথটিতে একজন নারী চিকিৎসকসহ চারজন চিকিৎসক রোগী দেখছেন। আর তৃতীয় বুথটি থেকে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীদের ওষুধপথ্য দেওয়া হচ্ছে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স এবং সিলেট প্রাইভেট হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় ইবনে সিনা সিলেট লিমিটেড এই চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। সেখানে নারী ও পুরুষের জন্য দুটি পৃথক সারি করা হয়েছে। দুপুর ১২টার দিকে নিবন্ধন ও চিকিৎসক দেখানোর অপেক্ষায় ছিলেন প্রায় ৮০০ বন্যার্ত মানুষ। সকাল থেকে দুই শতাধিক মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে বলে জানান দায়িত্বরত ব্যক্তিরা।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানিবাহিত রোগে আক্রান্তদের ভিড় বেড়েছে উপজেলা হাসপাতালে। তাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের ভর্তি করা হচ্ছে, অন্যরা চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।’
এদিকে সুনামগঞ্জে বন্যার পানি গেল দুদিন ধরে কমতে শুরু করেছে তবে পানি কমলেও কমেনি মানুষের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি। পানি নামার সাথে প্রকট হচ্ছে দুর্ভোগের চিত্র। দেখা দিচ্ছে নানা রোগ-বালাইও।
জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য মতে, বন্যার পানিতে বাড়ছে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জ্বর সর্দিসহ পানিবাহিত নানা রোগ। প্রতিদিন জেলার প্রত্যেকটি হাসপাতালে অন্তত শতাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে। এ ছাড়াও রয়েছে সাপে কাটা রোগীও।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া আর চর্মরোগ নিয়ে প্রতিদিন রোগীরা আসছে, পানি কমার পর এসব রোগ-বালাই আরও প্রকট হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন মো. আহমেদ হোসেন জানান, সুনামগঞ্জ বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবায় প্রত্যেক উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নসহ ১২৩ মেডিকেল টিম কাজ করছে। প্রত্যেক উপজেলা জীবাণুনাশক মেডিসিন দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা ইউনিট করে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত কতজন এসব পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত তার হিসাব নেই। এগুলোর ডাটা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সিলেট-সুনামগঞ্জের মতো একই অবস্থা উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে। চলতি বন্যায় জেলায় ৪৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সদরের দুটি ক্লিনিকের রুমের ভেতর হাঁটুপানি হওয়ায় আসবাবপত্র ওষুধ অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর বাকি ক্লিনিকগুলোরও কম বেশি একই অবস্থা।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা নয় উপজেলায় ২৭৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি ক্লিনিক বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। জেলায় বানভাসি মানুষের মাঝে ৮৫টি মেডিকেল ডিম কাজ করছে বলে জানা গেছে।
সদরের হলোখানা ইউনিয়নের লক্ষ্মিকান্ত এলাকার বাচ্চু মিয়া বলেন, আমাদের লক্ষ্মিকান্ত ক্লিনিকে ৪-৫ দিন থেকে পানি ওষুধ নিয়ে অন্যখানে রাখা হয়েছে। ডাক্তার আসে না, আমরা এখান থেকে ওষুধ নিতে পারছি না।
একই এলাকার মফিজুল হক বলেন, ‘চারিদিকে পানি, ক্লিনিকেও পানি। হামরা যে টুকটাক চিকিৎসা নেমো তাও পাই না। খুব একটা সমস্যাত পরছি বাহে।’
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মঞ্জুর-এ মোর্শেদ জানান, কুড়িগ্রাম জেলার বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা প্রদানে আমাদের ৮৫টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এ ছাড়াও বন্যাকবলিত ৪৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা চলমান রয়েছে। জেলায় ৮৫টি মেডিকেল টিমের মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইন ও জরুরি ওষুধ প্রদান করা হচ্ছে।