প্রায় ১৬ বছর আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মা-মেয়েকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালতে চারজনের মৃত্যুদন্ডের রায় হয়। ১৪ বছর আগে এই রায় হওয়ার পর তাদের মধ্যে তিনজনের ঠাঁই হয় কারাগারের কনডেম সেলে। একজন এখনো পলাতক। আপিল বিভাগের রায়ে কনডেম সেলে থাকা তিনজনের মধ্যে দুজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আরেকজনের মৃত্যুদন্ডের সাজা রদ করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ এ রায় দেয়। বেঞ্চের অপর দুই বিচারক বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।
খালাস পাওয়া দুজন হলেন ইসমাইল হোসেন বাবু ও সোনারুদ্দি। তরিকুল ইসলাম নামের আরেক আসামির মৃত্যুদন্ড রহিত করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। তবে পলাতক মৃত্যুদন্ডের আসামি মো. মোক্তারের দন্ড বহাল রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের কনডেম সেলে থাকা, একজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পারিপাশির্^ক সাক্ষ্য-প্রমাণ অভিযোগের সঙ্গে সন্নিবেশিত না হওয়ায় দুজনকে খালাস এবং একজনের দন্ড কমিয়ে রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ। সংক্ষিপ্ত রায়ের বরাত দিয়ে আইনজীবীরা বলেন, খালাসপ্রাপ্ত দুজনের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাদের দ্রুত কনডেম সেল থেকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ। এখন আদালতের রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট কারাগারে যাবে। সেখানে নথি যাচাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হলে দুজন মুক্তি পাবেন। এছাড়া তরিকুলকে কারাবিধি অনুযায়ী কনডেম সেল থেকে নিয়ে যাওয়া হবে সাধারণ সেলে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্যমতে, ২০০৬ সালের ২০ অক্টোবর রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ধোয়াপাড়া যৌবন গ্রামের সৌদি প্রবাসী মো. বজলুর রহমানের বাড়িতে হানা দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার স্ত্রী মিলিয়ারা খাতুন ওরফে মিলু (৩০) এবং তার মেয়ে পারভীন ওরফে শাবনূরকে (৯) গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরদিন মিলিয়ারার বাবা রফিকুল ইসলাম স্থানীয় থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি মামলা করেন। এ মামলায় একই এলাকার সোনাদ্দি ওরফে সোনারুদ্দি, ইসমাইল হোসেন বাবু, তরিকুল ইসলাম ওরফে ভুতা এবং মো. মোক্তার নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আসামি তরিকুল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্ত শেষে চারজনকে অভিযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। আসামিদের মধ্যে মোক্তার ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘরে থাকা ৫০ হাজার টাকার লোভে ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা করে আসামিরা। এ ছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে মিলিয়ারাকে হত্যার আগে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল চার আসামির সবাইকে মৃত্যুদন্ডের সাজা দেয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী দন্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি কনডেম সেলে থাকা তিন আসামি আপিল করেন। মোক্তার পলাতক থাকায় আপিলের সুযোগ পাননি।
শুনানি শেষে বিচারপতি সহিদুল করিমের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ এক রায়ে তিন আসামির আপিল খারিজ করে বিচারিক আদালতের দেওয়া সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখে। এরপর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন সোনারুদ্দি ও ইসমাইল। তরিকুলের পক্ষে জেল আপিল হয়। শুনানি শেষে গতকাল এ রায় হলো।
আদালতে ইসমাইলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। সোনারুদ্দির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা। তরিকুলের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এস এম বকস কল্লোল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ।
রায়ে বলা হয়েছে, এর সংক্ষিপ্ত অনুলিপি কারাগারে দ্রুত পৌঁছাতে হবে এবং দ্রুত দুজনকে মুক্তি দিতে হবে।
অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালাস পাওয়া দুজনকে মুক্তি দিতে এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তরিকুলকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ সেলে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ফলে ১৪ বছর পর এ তিনজনের কনডেম সেল জীবন শেষ হতে যাচ্ছে।’