দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সব প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া এখন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা সদরে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) কোর্ট ভবন নির্মাণ প্রকল্পেরও একই হাল। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া ৭১৩ কোটি টাকার প্রকল্পের মেয়াদ চারবার বাড়ানোর পর প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়ে দাঁডিয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবুও সর্বশেষ সংশোধনীতে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে যৌথভাবে আইন ও বিচার বিভাগ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর। তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব আগামীকাল মঙ্গলবারের একনেক সভায় অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্প সংশোধনে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বলছে, ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, দরপত্রসংক্রান্ত মামলা, নেত্রকোনা জেলায় চিফ জুডিশিয়াল আদালত ভবন নির্মাণ বাদ দেওয়া, পাহাড়ি এলাকার জন্য স্বতন্ত্র নকশা ইত্যাদি কারণে ব্যয় বাড়ছে।
এ ছাড়া ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে তারা আরও বলছে, ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজ বাদ দেওয়া, এজলাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, গ্যারেজ নির্মাণ, গ্লাস পার্টিশন স্থাপন অন্তর্ভুক্তি, অতিরিক্ত ৩০ হাজার গ্যালন ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণ, রাস্তা ও সীমানাপ্রাচীরের ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা জানিয়েছে, মূল প্রকল্পটি ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল একনেক সভায় ৭১৩ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে অনুমোদন হয়। বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয় ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৪ জুন পর্যন্ত। পরে প্রকল্পের মেয়াদ অপরিবর্তিত রেখে সংশোধন করা হয় এবং সংশোধিত প্রকল্প মোট ৮৭০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। তখন ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
পরে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করে দ্বিতীয়বার সংশোধন করা হয় এবং সংশোধিত প্রকল্পটি মোট ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬ সালের ২৪ মে একনেকে অনুমোদিত হয়। এরপর ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। ওই সময় জমি অধিগ্রহণজনিত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আইন ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে প্রকল্পটি মোট ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ সংশোধন করা হয়। পরে ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
২০২১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ১ হাজার ৮৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা সর্বশেষ অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৯০ শতাংশ। এ পর্যায়ে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করে তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ২৬০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা সর্বশেষ অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে ২০৪ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কম।
এর আগে ২০১৮ সালে চার শর্ত দিয়ে দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ‘বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সদরে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) কোর্ট বিল্ডিং নির্মাণ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ধীরগতির পরিপ্রেক্ষিতে মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে পরিকল্পনা কমিশন।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ আবার বাড়ানোর কারণ মূল প্রকল্পে ২৭টি জেলায় কোর্ট বিল্ডিং নির্মাণের সংস্থান থাকলেও কাজ শুরুর আগেই প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে জেলার সংখ্যা ৩৪টি বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে আবারও সংখ্যা বাড়িয়ে মোট জেলার সংখ্যা করা হয় ৪২টি। এ জন্যই মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে।
২০১৮ সালে প্রকল্পটির মূল্যায়ন করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অদূরদর্শী ডিজাইনে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটিতে দেখা দিয়েছে পাঁচ ধরনের ঝুঁকি। সঠিক সময়ে প্রকল্প শেষ না হওয়া, খরচের পরিমাণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, আইনজীবীদের অনীহার কারণে নির্মিত ভবন অব্যবহৃত থাকার আশঙ্কা এবং জেলা জজ আদালতের পাশাপাশি জমি পাওয়া না গেলে ভবিষ্যতে আইনজীবীদের সঙ্গে মনোমালিন্যের আশঙ্কা।