কাগজ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বিভিন্ন অজুহাতে আমদানি করা হচ্ছে কাগজ। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আমদানি করা এসব কাগজ ঢুকছে দেশে, বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে। এতে টিকতে পারছে না ৭০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই খাতটি। নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে লোকসানে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। একই কারণে ১০৬টি কাগজকলের মধ্যে ৭৯টির বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ এসব কারখানায় প্রত্যক্ষভাবে ১৫ লাখ, পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ। এ অবস্থায় বিদেশি কাগজে বাড়তি শুল্ক চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)।
চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ ও কাগজ আমদানিতে শুল্ক না বাড়ানো হলে দেশীয় কাগজশিল্প অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু ভুঁইফোড় ও স্বার্থান্বেষী আমদানিকারক এবং মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান দেশীয় মিল থেকে কাগজ সংগ্রহ না করে রেয়াতি শুল্কে কাগজ আমদানির চেষ্টা করছে। যেখানে দেশীয় কাগজকলকে উৎপাদিত কাগজ বাজারজাতকরণের জন্য ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রদান করতে হয়, সেখানে রেয়াতি শুল্কে কাগজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে স্থানীয় ও আমদানিকৃত কাগজের মধ্যে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে।
শিল্পটির উদ্যোক্তারা বলছেন, রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি হওয়া কাগজ, বোর্ড, বস্ত্রসহ নানা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ায় কঠিন সময়ের মুখোমুখি দেশি এই শিল্প। তারা দাবি করে আরও বলছেন, দেশি কাগজের শিল্প খাত বাঁচাতে কাগজ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে আমদানিকৃত ফিনিশড পণ্যের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০৬টি কাগজকলে ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ছয় হাজার ১১২ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। এ অবস্থায় দেশীয় কাগজশিল্পকে প্রায় বিনা শুল্কে আমদানিকৃত বিদেশি কাগজের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেওয়াটা এই শিল্পের জন্য হুমকি।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) মহাসচিব ও মাগুরা পেপার মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল মহীউদ্দিন বলেন, ‘সব ধরনের কাগজ তৈরির সক্ষমতা আমাদের আছে। দেশে কোনো ধরনের কাগজ আমদানির প্রয়োজন নেই। যেখানে বাংলাদেশ থেকে ৪০টির বেশি দেশে কাগজ রপ্তানিও হচ্ছে সেখানে কাগজ আমদানি যথার্থ নয়। আমদানি রুখতে শুল্ক দু-তিন গুণ বাড়ানো উচিত।’
চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন : দেশের কাগজকলগুলো অফসেট, নিউজপ্রিন্ট, লেখা ও ছাপার কাগজ, প্যাকেজিং পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, মিডিয়া পেপার, লাইনার, স্টিকার পেপার, সিকিউরিটি পেপার ও বিভিন্ন গ্রেডের টিস্যু পেপার উৎপাদন করে। তবে উৎপাদিত পণ্যের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই লেখা এবং ছাপার কাগজ, যা শিক্ষার অন্যতম উপকরণ। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। দেশে বিভিন্ন ধরনের কাগজের চাহিদা প্রায় ৯ লাখ টন। তবে দেশীয় কাগজকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। কাগজকলগুলোর মধ্যে ২০ থেকে ৩০টি মিল বড়। বাকিগুলো ছোট কারখানা। দেশের পেপার মার্কেটের আকার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে মোট বাজারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লেখা ও ছাপার কাগজ পণ্য। আর অবশিষ্ট ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অন্যান্য পণ্য।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার : দেশীয় কাগজশিল্প উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে দেশে অবাধে ঢুকছে আমদানিকৃত কাগজ। প্রায় বিনা শুল্কে আনা এসব কাগজ খোলাবাজারে দেদার বিক্রি হওয়ায় দেশীয় কাগজশিল্প মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
এ ব্যপারে বিপিএমএর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিগত দিনে পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের জন্য দেশের কাগজকলগুলো গুণগত মানসম্পন্ন কাগজ সরবরাহ করে এসেছে। কাগজশিল্প বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প খাত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাগজশিল্প আমদানি বিকল্প, রপ্তানিমুখী ও পরিবেশবান্ধব শিল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তাই রেয়াতি সুবিধায় কাগজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে আত্মঘাতী।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিনা শুল্কে আমদানিকৃত কাগজজাতীয় পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে এরই মধ্যে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এর সঙ্গে বিনা শুল্কে পাঠ্যপুস্তকের জন্য ব্যবহৃত কাগজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে। দেশের কাগজশিল্প লোকসানে শেষ হয়ে যাবে।’