যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রথম দিনেই পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই যুবক নিহত হয়েছেন। চলন্ত মোটরসাইকেলে ভিডিও করার সময় দুর্ঘটনায় আহত হয় তারা। দুর্ঘটনার পরই সেতু দিয়ে সোমবার থেকে মোটরসাইকেল পারাপার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি নোটিসও জারি করে সেতু বিভাগ।
স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরেই এই দুর্ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। বিষয়টি এমন নয় যে পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ করলেই দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালক ও পদ্মা সেতু উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা যা করণীয়, সেগুলো সরকারকে করতে হবে। বড় বড় সেতুতে ট্রাফিক আইন যথাযথ পালনের মাধ্যমে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পদ্মা সেতুতেও সে রকম কিছু করা যায় কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল অনেক বেড়ে গেছে, তারা ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল করছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছি। এখানে লক্ষণীয় যে, আমাদের দেশে মোটরসাইকেলে চলাচল নতুন কিছু নয়; তেমনি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাও নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ঘটনার হার এমন উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ভাড়ার বিনিময়ে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন। দেশের যুবসমাজের একটি অংশের জীবিকা উপার্জনের উপায় তথা পেশা হিসেবে বিকশিত হচ্ছে। এই পর্যায়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার উচ্চ মাত্রা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। দেশের শ্রমশক্তির সবচেয়ে উৎপাদনক্ষম অংশ যুবসমাজ; অথচ দুঃখজনকভাবে তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার খুব বেশি। এ অবস্থায় যখন নানা ধরনের বিকল্প জীবিকার সন্ধান চলছে, তখন এটা নিশ্চিত করা দরকার যে তাদের জীবিকা নিরাপদ হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ ঝুকি কমাতে হলে ব্যক্তিগত ও সরকারি উভয় পক্ষে কতগুলো দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রথমত, মোটরসাইকেল চালকদেরই বুঝতে হবে যে ট্রাফিক আইনের সব বিধান মেনে সতর্কতার সঙ্গে মোটরসাইকেল না চালালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই দুর্ঘটনার প্রথম শিকার নিজেকেই হতে হয়। তাতে মৃত্যু ঘটতে পারে, সৌভাগ্যক্রমে তা না ঘটলে এমন অঙ্গহানির আশঙ্কা থাকে, যাতে সারা জীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারাতে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, মোটরসাইকেল চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশকে তৎপর হতে হবে। লাইসেন্সহীন ও ত্রুটিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। মোটরসাইকেলের চালক ও অন্য আরোহীকে অবশ্যই হেলমেট পরতে হবে; ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে সড়কে বেরোতে পারবেন না এটা নিশ্চিত করা দরকার; ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াটিও যথাযথ হওয়া দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা।
পদ্মা সেতু আমাদের বহু আকাক্সিক্ষত একটি উন্নয়ন প্রকল্প। এই অবকাঠামো ঘিরে জনসাধারণের মধ্যে আগ্রহ, উদ্দীপনা যেমন ছিল তেমানি সেতু চালু হওয়ার পর আবেগ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বাড়াবাড়ি থাকবে এটাও আমরা মেনে নিয়েছি। সেতু চালু হওয়ার পরে সেতুতে দাঁড়িয়ে বসে এমনকি শুয়ে ছবি তুলতে দেখা গেছে। আবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভিডিও তৈরি করার ঘটনাও ঘটেছে। এমন ভিডিও তৈরি করতে গিয়েই হতাহতের ঘটনায় দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অথচ, সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিতদের কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনে সেতুর ওপর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখলে নিয়ম ভঙ্গকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা যেত। সেতু ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর টহল ব্যবস্থা করা যেত। তা না করে শুরুতেই মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কোনো মতেই গ্রহণীয় নয়। সেতু বিভাগ ও প্রকল্পের সূত্র থেকে জানা গেছে, সেতু চালুর প্রথম ৮ ঘণ্টায় পদ্মা সেতু দিয়ে ১৫ হাজারের বেশি গাড়ি পার হয়েছে। এর ৬০ ভাগের বেশি ছিল মোটরসাইকেল। এ থেকে বোঝা যায় যানবাহন হিসেবে মোটরসাইকেলের ব্যবহার-উপযোগিতা। বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেল চালকের কথা বিবেচনা রেখে দেশের অন্যান্য সেতুর মতো পদ্মা সেতুতেও মোটরসাইকেল চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। মোটরসাইকেল চলাচল নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে সবকিছু শারীরিকভাবে করারও প্রয়োজন নেই। যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেখানে পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে করা যাবে না কেন? ভবিষ্যতে আমাদের এ রকম প্রযুক্তি আয়ত্তে আনতে হবে। আমরা আশা করি, দ্বিতীয় দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।