উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে কর্মসংস্থানসহ দেশের অর্থনীতিতে অগ্রগতি সাধনের আশাবাদ নিয়ে দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য একসঙ্গে দুটি স্টার্ট-আপ তহবিল গঠনের কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ব্যাংকগুলো স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী নয়। তারা স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানকে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। যদি কোনো স্টার্ট-আপ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তবেই তাদের অর্থায়ন করবে ব্যাংক। এ কারণে বেশিরভাগ স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান এ তহবিল থেকে ঋণ পাচ্ছে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডিদের নিয়ে ব্যাংকার সভা করেন গভর্নর। ওই সভায় স্টার্ট-আপ তহবিল গঠন ও ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলোকে তাগাদা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা জারির পর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ছয়টি ব্যাংক স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো যমুনা, ইস্টার্ন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, উত্তরা, সিটি ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এখন পর্যন্ত ১৭টি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান এ ব্যাংকগুলো থেকে ৫ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিমালা জারি করে ২০২১ সালে ২৯ মার্চ। ওই নীতিমালায় বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্ট-আপ তহবিল গঠন করবে। এছাড়া ব্যাংকগুলোও তাদের মুনাফা থেকে ১ শতাংশ অর্থ দিয়ে একটি তহবিল গঠন করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা ছিল, ব্যাংকগুলোও তাদের মুনাফা থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করবে। সেখান থেকে ব্যাংকগুলো স্টার্ট-আপদের অর্থায়ন করবে। তহবিলের থাকা অর্থের বেশি ঋণ বিতরণের দরকার হলে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন করবে।
তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত মে মাস পর্যন্ত ১৪ মাসে ৪৮টি ব্যাংক স্টার্ট-আপ তহবিল গঠন করেছে। প্রথম বছরে গঠিত তহবিলের আকার ১২৬ কোটি টাকা। কিন্তু তহবিল থেকে ৪২টি ব্যাংকই কোনো অর্থায়ন করেনি। ব্যাংকগুলো বলছে, তারা ভালো স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে না।
এ ঋণের সুদের হার মাত্র ৪ শতাংশ। গ্রাহক এক বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড পাবেন। ঋণ পরিশোধে সময় পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। একেকটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবে। এ ঋণ পেতে কোনো জামানত লাগবে না, উদ্যোক্তাদের শিক্ষাসনদই জামানতের কাজ করবে। তবে ব্যক্তিগত গ্যারান্টারের কথা বলা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাখা পর্যায়ে এখনো এ ঋণ বিতরণের কার্যক্রম শুরু করেনি অনেক ব্যাংক। ব্যাংক শাখাগুলোর এসএমই (্ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ) বিভাগের কর্মকর্তারা স্টার্ট-আপ ঋণের নীতিমালা সম্পর্কে জানেনও না। যে কয়টি ব্যাংক ঋণ দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই প্রধান কার্যালয়ের এসএমই বিভাগের মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণ করছে। তাছাড়া এ ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ক্রমোন্নতির পর্যায়ে (গ্রোথ লেভেল) অর্থায়ন করা হয়। ঝুঁকি বিবেচনায় প্রাক-প্রাথমিক (প্রি-সিড) বা প্রাথমিক (সিড) পর্যায়ে অর্থায়ন করছে না ব্যাংকগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২০ সালে যেসব ব্যাংক নিট মুনাফায় ছিল সেসব ব্যাংকে আবশ্যিকভাবে এ তহবিল গঠন করতে হবে। তবে ২০২০ সালে সাতটি ব্যাংক ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলো নিট মুনাফায় ছিল এবং ২০২১ সালে ১৩টি ব্যাংক ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা ছিল। ২০২০ সালের মুনাফা থেকে ৪৮টি ব্যাংক তহবিল গঠন করেছে এবং ২০২১ সালের তহবিল গঠনের কার্যক্রমও চলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস’ বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, দ্বিতীয় বছরের জন্যও ব্যাংকগুলো দ্রুত তহবিল গঠন করবে এবং তহবিলের আকার ২০২০ সালের মতো ১২৬ কোটি টাকা বা তার বেশি হবে। তবে মধুমতি ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক নিট মুনাফায় থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত এ তহবিল গঠনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়নি। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও স্টার্ট-আপ তহবিল গঠনে পিছিয়ে রয়েছে। যেসব ব্যাংক এ তহবিল গঠন করেনি তাদের বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা জারির এক বছরেরও বেশি সময় পরও ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে স্টার্ট-আপ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ানবাজার এলাকার পাঁচটি ব্যাংকের শাখায় যান এই প্রতিবেদক। এ ক্ষেত্রে ইংরেজি বর্ণমালার ‘এ’ থেকে ‘ই’ দিয়ে নাম এমন পাঁচটি ব্যাংক নির্ধারণ করে খোঁজ নেওয়া হয়।
এবি ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার কর্মকর্তারা জানান, তাদের ব্যাংক স্টার্ট-আপ তহবিলের কথা জানে। কিন্তু তাদের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি থাকায় এ তহবিলের ঋণ বিতরণের সুযোগ নেই। ব্র্যাক ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার এসএমই বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তারা এ তহবিল সম্পর্কে পত্রিকায় পড়েছেন। কিন্তু ব্যাংক থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এরপর সিটি ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখায় গেলে সেখানকার এসএমই বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তাদের কাছে স্টার্ট-আপ তহবিলের কোনো নির্দেশনা আসেনি। এমনকি তারা এ তহবিলের নীতিমালার কথা জানেনও না। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এটা তাদের করপোরেট শাখা। এখানে এ ধরনের কোনো ঋণ বিতরণের নির্দেশনা নেই। এরপর ইস্টার্ন ব্যাংকের সোনারগাঁও রোড শাখায় গিয়ে সেখানকার এসএমই বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের এ তহবিল সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে তারা পত্রিকা মারফত স্টার্ট-আপ তহবিলের নীতিমালা সম্পর্কে জেনেছেন।
এই পাঁচটি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম প্রতিবেদনে প্রকাশ না করলেও তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্যাদি দেশ রূপান্তরের সংরক্ষণে রয়েছে।
এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও স্টার্ট-আপ তহবিল সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
পরে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘স্টার্ট-আপ তহবিলের ঋণ আমরা প্রতিটি শাখা থেকে দিচ্ছি না। এটা পেতে হলে উদ্যোক্তাদের আমাদের এসএমই ইউনিটে আসতে হবে।’
তবে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমডি আবুল কাশেম মো. শিরিন ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা তাতে সাড়া দেননি। কী বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয়েছে তা লিখে এসএমএস করা হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ আছে, শাখা পর্যায়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ তহবিল সম্পর্কে না জানার ফলে তাদের পক্ষে সবসময় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এসএমই বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া ই-কমার্স খাতে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কিছু অনিয়মের কারণে এ খাতটিকে ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে প্রথমেই বাদ দিয়ে দিচ্ছে।
এই পাঁচটি ব্যাংকের একটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এসএমই বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তহবিলটি নিয়ে তারা কাজ করছেন। কিন্তু শাখা পর্যায়ে এ বিষয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না। স্টার্ট-আপদের যে তহবিল দেওয়া হচ্ছে তা মূলত প্রধান কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়নে দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি অনেকগুলো ব্যাংকের কাছ থেকে স্টার্ট-আপ তহবিলের ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শাখা থেকে জানানো হয় এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তারা ওই উদ্যোক্তাকে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস’ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক যুগ্ম পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর ১৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে স্টার্ট-আপ তহবিল থেকে উদ্যোক্তাদের অনুকূলে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সরাসরি দায়িত্ব গ্রহণ ও তদারকি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়। সে হিসেবে শাখা পর্যায়েও এ তহবিলের ঋণের নির্দেশনা থাকার কথা।
অন্য এক উদ্যোক্তা একটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এসএমই বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, স্টার্ট-আপ তহবিল থেকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে কোনো ঋণ দেওয়া হবে না। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এস্ক্রো (পণ্য পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ) পদ্ধতি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনার নির্দেশিকা চালুর পর থেকে ই-কমার্স খাতে প্রতারণার আর কোনো পথ খোলা নেই। তারপরও ব্যাংকগুলো এ খাতটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করছে।
তাহলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক কীভাবে অর্থায়ন জোগাড় করবে, ব্যাংকের অর্থায়ন কি এই খাতে মিলবে না এমন প্রশ্ন করেন ওই তরুণ উদ্যোক্তা। যেহেতু এ উদ্যোক্তার ভবিষ্যতেও অর্থায়নের দরকার হবে সে কারণেই তিনি পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথাগুলো বলেন।
শাখা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সত্যিই তারা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খুবই সতর্ক। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার ব্যবস্থাপক মাসুদ উর রহমান বলেন, ‘আমরা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক হিসাব খোলার বিষয়েই খুব সতর্কতা অবলম্বন করছি। অর্থায়ন করার বিষয় তো আরও পরের কথা।’
সিটি ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার এভিপি ও সিনিয়র রিলেশনশিপ ম্যানেজার একেএম ইমাম হাসান বলেন, ‘আমাদের শাখায় স্টার্ট-আপদের ঋণ দেওয়ার কোনো নির্দেশনা নেই। তবে এ খাতে ঋণ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের ঋণ দিলে সেই ঋণ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।’
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বিকশিত হতে পারে সে লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ এ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই এ তহবিলের নীতিমালা করা হয়েছে। এ নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো যথাযথ সহযোগিতা না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’