ঢাকার আশুলিয়ায় শিক্ষক উৎপল সরকারকে পিটিয়ে হত্যা ও নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তাকারীদের বিচার দাবি জোরালো হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধন থেকে এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি বিচার দাবি করা হয়েছে। বিচার চেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ১৭ বিশিষ্ট নাগরিক। নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। উৎপল সরকারের হত্যাকারী গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আশুলিয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ। স্বপন কুমারকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ১৭০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিন আসামিকে।
শিক্ষক হত্যা ও লাঞ্ছিত করা ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবে এখানে বক্তব্য দিচ্ছি, আমি জানি না আমি কতটুকু নিরাপদ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করছি।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতাকে যদি শেকড় থেকে তুলে না আনা যায়, তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এই বাংলাদেশ হয় পাকিস্তান হবে, নয় আফগানিস্তান হবে। এখনই সময় এর রশি টান দিয়ে ধরতে হবে। এর সঙ্গে যে কুচক্রী মহল যুক্ত আছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। উন্মুক্ত রাস্তায় জনসম্মুখে তাদের বিচার করা উচিত, তাহলেই শিক্ষা হবে।’
সমাবেশে জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সভাপতি কাজল দাস বলেন, ‘যে প্রজন্ম শিক্ষককে জুতার মালা গলায় পরায়, যে প্রজন্ম শিক্ষককে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে, সেই প্রজন্মের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। যে প্রজন্ম এখন শিক্ষা-দীক্ষা ও গবেষণায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই শিক্ষার্থীরা আজ ইয়াবা, নেশায় আসক্ত হয়ে শিক্ষকদের নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে একই দাবিতে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সমাবেশে বক্তারা এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
সমাবেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘পুলিশের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, সম্মান রক্ষা করা। যেসব পুলিশ সদস্য নড়াইলের স্বপন কুমারের ঘটনায় দায়িত্ব পালন করতে পারেনি তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘অতীতে এমন যেসব ঘটনা ঘটেছে সেসবের বিচার হয়নি। এতে অপরাধীরা মনে করে, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে বাধা কোথায়। এ ঘটনাগুলোর কেন বিচার হয় না, অপরাধীরা শাস্তি পায় না এর জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার।’
সমাবেশে নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘আজকে যখন সবাই তাকিয়ে আছি পদ্মা সেতুর আলোকচ্ছটার দিকে তখন আমরা খেয়াল করছি কী এক ভয়াবহ অন্ধকার আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে। এর আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। আমার ভাবতে অবাক লাগে শিক্ষকদের এত সংগঠন রয়েছে। কিন্তু একটি সংগঠনও এর প্রতিবাদ করল না কেন?’
১৭ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি : ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা ও নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ১৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা বলেছেন, তারা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছেন, বাংলাদেশের সমাজ ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পথ হারানোর আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বলা হয়, চলমান ঘটনায় প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশ আজ সাম্প্রদায়িকতার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত। দেশে মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। সামাজিক মর্যাদা অদৃশ্য। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাম্প্রদায়িকসহ সব অপশক্তিকে কঠোর হাতে দমন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিশিষ্ট নাগরিকরা।
বিবৃতিদাতারা হলেন হাসান ইমাম, অনুপম সেন, সেলিনা হোসেন, রামেন্দু মজুমদার, সারোওয়ার আলী, ফেরদৌসী মজুমদার, আবেদ খান, আবদুস সেলিম, লায়লা হাসান, মফিদুল হক, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, হারুণ হাবীব, শফি আহমেদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিমূল ইউসুফ ও সারা যাকের।
ঢাবি শিক্ষক সমিতির নিন্দা : শিক্ষক লাঞ্ছনা ও হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। গতকাল বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সম্প্রতি শিক্ষক নির্যাতনের দুটি ভিন্ন ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নজরে এসেছে। দুটি ঘটনাতেই তীব্র সামাজিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম নিয়ে একশ্রেণির মানুষের অপতৎপরতা দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মূল্যবোধকে চরমভাবে আঘাত করছে, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার হীন উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।’
সাভারে রাজপথে শিক্ষক-শিক্ষার্থী : গতকাল সকালে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়েছে। আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ছাড়াও নিহত শিক্ষকের পরিবার এবং এলাকাবাসীরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তারা শিক্ষক হত্যাকারী জিতু গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে মামলার প্রধান আসামি কিশোর গ্যাং লিডার জিতুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের স্কুল ও কলেজে ৫৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকা রয়েছেন। উৎপল স্যার এখানে ২০১৩ সাল থেকে চাকরি করেন। স্যার আমাদের এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। ঘটনার সময় আমি ছিলাম না।’
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সকাল ১০টার দিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপপরিদর্শক (কলেজ) মো. রবিউল আলম। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান স্যারের নির্দেশে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে আজ (গতকাল) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করা হলো। সার্বিক বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে জিতুকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেছেন। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আমরা অভিযানে আছি, সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। খুব দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হবে।
নড়াইলে তিনজন গ্রেপ্তার : নড়াইলে পুলিশের সামনে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে অপদস্থের ঘটনার ৯ দিনের মাথায় থানায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় সোমবার রাতে পৃথক পৃথক অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ ও কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় নিজের ফেইসবুক আইডিতে নূপুর শর্মার ছবি ব্যবহার করে লেখেন-প্রণাম নিও বস ‘নূপুর শর্মা’ জয় শ্রীরাম। এ পোস্ট দেওয়ার পর গত ১৮ জুন সকালে কলেজে আসেন রাহুল। এরপর তার বন্ধুরা পোস্টটি মুছে ফেলতে বললেও সে পোস্ট মুছেননি রাহুল। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জানান। একপর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কলেজের সব শিক্ষকের পরামর্শে রাহুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে কলেজ চত্বরে থাকা শিক্ষকদের তিনটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় তারা। বিকেলে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস এবং শিক্ষার্থী রাহুল দেব রায়কে গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রতিবাদ জানান। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ঘটনাটি তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জুবায়ের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সদর থানার ওসি শওকত কবির বলেন, তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা কেউ ছাড়া পাবে না। দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।