প্রকল্প তদারকিতে আইএমইডির সক্ষমতা বাড়াতে হবে

সরকারি প্রকল্প তদারককারী ‘বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ’ (আইএমইডি) এর সক্ষমতা বাড়িয়ে এ বিভাগের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে বিকেন্দ্রীকরণ করে অন্তত বিভাগীয় পর্যায়েও এর কার্যক্রম থাকা উচিত।

গতকাল বুধবার গুলশানের লেকশোর হোটেলে সিপিডি ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে পাবলিক অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনা সংলাপে অংশ নেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনবল সংকটে ভুগছে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠান। এদের ৩৩৮টি পদের মধ্যে ১২৩টি এখনো ফাঁকা। এদের পক্ষে হাজার হাজার প্রকল্প দেখভাল করা সম্ভব না। তারা পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে কাজ করালে সেই পরামর্শক ঠিকমতো কাজ করছে কি না সেটাও দেখা দরকার রয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচিত অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) মতো একটি উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করা এবং নতুন ক্যাডার তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৫৬টি প্রকল্প উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে আছে। এরমধ্যে ১ হাজার ২৫০টিই হলো বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও অবকাঠামোগত প্রকল্প। যদি সাশ্রয়ীভাবে করতে পারি তাহলে আরও বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া যাবে।

বৈদেশিক ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণের সুদ আগামীতে আরও বাড়তে থাকবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে গ্র্যাজুয়েশনে যাচ্ছি, এর অর্থ হলো আমাদের বাজার সুবিধা নির্ভর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা থেকে উৎপাদনশীলতা নির্ভর সক্ষমতায় যেতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য ৯৬০ বিলিয়নের যে ব্যয় তার মধ্যে ২৫০ বিলিয়ন ডলার অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত। এটা ভালোভাবে করতে পারলে বেসরকারি বিনিয়োগ সহজেই আসবে।

 বৈশি^ক প্রতিযোগিতার র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা অবকাঠামোর মান এগুলোতে আমাদের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়াতে নিচের দিকে আছে। এডিপি বিশ্লেষণে আমরা দেখি, দেশের অনেক প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। শুধুমাত্র ২০২১-২২ অর্থবছরের যে ৩১টি প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে তা টাকার অঙ্কে ২৯ হাজার ৪৭১ টাকা। তা দিয়ে আরেকটা পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত। আমাদের প্রকল্পগুলোতে নতুন প্রকল্প খুবই কম।

তিনি বলেন, আইএমইডি অনেক পর্যালোচনা দিয়েছে তাতে দেখা যায়, মূল প্রকল্প প্রস্তাবনা যখন দেওয়া হচ্ছে তখন দেখা যায় স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শ ঠিকমতো হয় কি না সেটি নিয়ে তারা মূল্যায়ন করেছে। জমি অধিগ্রহণ আমাদের দেশে অন্যতম সমস্যা। ফিজিবিলিটি কোয়ালিটি ঠিকভাবে যাচাই করা হয় না বলে পর্যালোচনায় জানিয়েছে আইএমইডি।

তাদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, একজন প্রকল্প পরিচালক বিভিন্ন প্রকল্পে আছেন। ঠিক মতো সময় দিতে পারেন না। মাঠে যেতে পারেন না। এগুলো আইএমইডি প্রতিবেদনে বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে আসছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। আইএমইডি মন্ত্রণালয়গুলোকে যেভাবে পর্যালোচনা দেয়, মন্ত্রণালায়গুলো তা মোটেও মানে না। বছরের পর বছর মন্ত্রণালয়গুলো তা এড়িয়ে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট সামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হয়, তা যাতে ব্যয় সাশ্রয়ী হয়। যাতে করে এ প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক রিটার্ন আমরা পাব সেগুলো যাতে পেতে পারি।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পগুলো যখন আমরা নেব, সেটার কেন দরকার, কী কী কাজে লাগবে। তার রিটার্ন কেমন হবে তা দেখতে হবে। বাংলাদেশ বা যেকোনো দেশে প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর তার প্রভাব জনগণের ওপর কীভাবে পড়বে তার কী জাস্টিফিকেশন তা ঠিক করতে হবে। এগুলোর মধ্যে সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবও থাকে। যে প্রকল্প শুরু করেছি তিন-চার বছর আগে দেখা যাচ্ছে, এখনো সেগুলোর কাঁচামাল আনতে পারিনি। যেগুলো অধিকাংশই বাইরে থেকে আনতে হয়। প্রকল্পের জন্য ঠিকাদার নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক মানের কি না, তাও বিবেচনায় নিতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান আছে। প্রকল্প পরিচালনার জন্য আলাদা ক্যাডার তৈরি করা যায় কি না সেটিও একটি বিবেচ্য বিষয়। এটি মাথায় নিতে হবে। তারা প্রকল্প পরিচালনায় থাকবেন তাদের ট্রান্সফার যাতে না হয়। অন্যদিকে যথেষ্ট পরিমাণ জমি পাওয়ার জটিলতায় প্রকল্প শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ঢাকা ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর, এখানে অবকাঠামো উন্নয়নের কোনো শেষ নেই। অন্যদিকে যাত্রী ও পণ্য সেবার ৭০ শতাংশ বহন করে সড়ক পরিবহন। ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ান টাইগারদের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ৬ থেকে ৮ শতাংশ। এ বাজেটে বাংলাদেশে এবার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও তা অনেক নিচে।

তিনি আরও বলেন, অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের দায়কে আমরা ভুল বুঝি। আমাদের পিপিপির বোর্ডে শুধু পাবলিক আছে কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান নেই। নাগরিকদের মধ্যে অনেক অভিজ্ঞ লোক আছে যিনি বেসরকারি খাত থেকে গিয়ে সেখানে কিছু যোগ করতে পারেন। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই এসেছে পাবলিক সেক্টর থেকে। এটি কমানো দরকার।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, সামনের দিনগুলোতে অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন বিষয়টি গত কয়েক দশক থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী দিনগুলোতে বৈদেশিক বিনিয়োগ ৬ গুণ বাড়াতে হবে। রপ্তানি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৯ গুণ বিনিয়োগ বোড়াতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন বাড়োতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।