দেশের রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদনকারীদের স্বস্তির খবর দিয়েছে সরকার। আমদানিনির্ভর ভোজ্য তেল সয়াবিনের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে উৎপাদিত রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানিতে যে নিষেধাজ্ঞা সরকার দিয়েছিল তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে এক মাসেরও বেশি সময় নিষেধাজ্ঞায় থাকার পর আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে আবারও রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানি করতে পারবেন উৎপাদনকারীরা। এতে রপ্তানির মাধ্যমে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মূলত দেশে চাহিদা না থাকায় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ভোজ্য তেলের মূল্য কমে যাওয়া এবং স্থানীয় বাজারে রাইস ব্র্যান তেলের চাহিদা না থাকায় চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানির ওপর গত ২৪ মে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলো।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এবং মালয়েশিয়ায় শ্রমিকের অভাবে পাম তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টন ২ হাজার মার্কিন ডলার এবং পাম তেলের টন ১ হাজার ৯৫০ ডলারে ওঠে। এ অবস্থায় দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চলতি বছরের ১৬ মার্চ সরকার আমদানিপর্যায়ে ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করেছে। তবে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার পরও দেশের বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। স্থানীয় চাহিদা পূরণে সরিষা, ক্যানলা ও রাইস ব্র্যান তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেয় সরকার। একই সঙ্গে রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার।
সরকারের এ নিষেধজ্ঞায় বিপাকে পড়ে যান রাইস ব্র্যান তেলের উৎপাদকরা। দেশে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় রাইস ব্র্যান তেল মূলত ভারতে রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পাশাপাশি জাপানসহ বিশে^র আরও কয়েকটি দেশে এর ভালো চাহিদা রয়েছে। জাপানে রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে মিনোরি বাংলাদেশ নামে একটি জাপানি কোম্পানি দেশে বন্ধ থাকা এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ অধিগ্রহণ করে। কোম্পানিটি যখন পরিশোধিত রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি নেয় তখনই এ তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে মিনোরিসহ অন্যান্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে রাইস ব্র্যান তেল রপ্তানির আবেদন জানালে গতকাল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টন রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদন হয়। তবে দেশে চাহিদা কম থাকায় অধিকাংশ উৎপাদক ভারতে রাইস ব্র্যানের ক্রুড অয়েল রপ্তানি করে থাকে। অধিকাংশ উৎপাদকের পরিশোধন কারখানাও নেই।
প্রসঙ্গত, উৎপাদন কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়া পাম তেল এবং শ্রমিক সংকটের কারণে মালয়েশিয়া সয়াবিন তেল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই ভোজ্য তেলের বাজারে অস্বস্তি তৈরি হয়। ইন্দোনেশিয়ার এই ঘোষণার আগে থেকেই অবশ্য বাংলাদেশের পাইকারি বাজারে পাম তেলের দাম কমছিল। ঈদের পর সরকার খোলা পাম তেলের দর বেঁধে দেয় মণপ্রতি ৬ হাজার ৯৫০ টাকা। তিন দিন পর সেই তেল বিক্রি হয় ৬ হাজার ৪০০ টাকা। পরে আরও কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম অব্যাহতভাবে কমতে থাকায় দেশে ভোজ্য তেলের সরবরাহ পরিস্থিতিও উন্নতি হচ্ছে। রাইস ব্র্যান তেলের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগেই গতকাল দাম কমে মণপ্রতি ৫ হাজার ৮৫০ টাকা থেকে ৫ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) হিসাবে সয়াবিন, পাম, সরিষা ও রাইস ব্র্যান তেল মিলিয়ে দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। চাহিদার বেশিরভাগ ১৩ লাখ টনই পাম তেল এবং ৫ লাখ টন সয়াবিন। বাকিটা সরিষা, রাইস ব্র্যানসহ অন্য তেল। বর্তমানে সয়াবিন ও পাম তেল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। ১৩ লাখ টন পাম তেল আমদানির বড় অংশ অর্থাৎ ৯০ শতাংশই আমদানি হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে। বাকি ১০ শতাংশ আমদানি হয় মালয়েশিয়া থেকে।