নাস্তিক আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক রতন সিদ্দিকীর বাসায় হামলা

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকীর বাসায় হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানী ঢাকার উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ৬/এ সড়কের বাসায় জুমার নামাজের পর মুসল্লি পরিচয়ে একদল লোক হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। এ সময় রতন সিদ্দিকী ও তার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফাহমিদা হককে গালমন্দ করা হয়। এছাড়া হামলাকারীরা তাদের বাসার সামনের অংশ ভাঙচুর করে বলে জানিয়েছেন এ দম্পতি। অবশ্য পুলিশ বলছে, সেখানে হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

রতন সিদ্দিকী জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একসময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, প্রখ্যাত নাট্যকার, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকীর বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, থিয়েটার পত্রিকা ক্ষ্যাপাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। এছাড়া সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ আরও অনেকে নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

রতন সিদ্দিকীর বাসার পাশেই একটা স্কুল, মাদ্রাসা ও মসজিদ রয়েছে। এই শিক্ষাবিদের পরিবারের অভিযোগ, বাসার ফটকের সামনে সবজির ভ্যান ও মোটরসাইকেল রেখে প্রায়ই সড়ক আটকে রাখা হয়। হামলার বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়ি নিয়ে বাসায় ফেরার সময় প্রধান ফটকে মোটরসাইকেল থাকায় গাড়ি ঢোকানো যাচ্ছিল না। সেটি সরানোর জন্য হর্ন বাজিয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি চেষ্টা করেন গাড়িচালক। তখন বাসার বিপরীত দিকের মসজিদ থেকে এক মুসল্লি এসে বলেন, “এই হর্ন বাজাচ্ছেন কেন?” তখন আমি তাকে বলি, আমি হর্ন বাজাতে বলিনি, বরং চালককে নিষেধ করেছি। কিন্তু তিনি সে কথা মানতে নারাজ। উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করেন। আরও মুসল্লি এসে তার সঙ্গে যোগ দেন। হঠাৎ একজন দাবি করেন, আমি নাকি ধর্মের নামে ভ-ামি হয় এমন কথা বলেছি। এ পর্যায়ে গাড়িতে থাকা আমার স্ত্রী ফাহমিদা হক তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, “কী বলছেন আপনি এসব? আমরা কখন এমন কথা বললাম?” তখন থেকেই তারা আরও বেপরোয়া আচরণ শুরু করে। একজন বলে, “এই বেটি চুপ কর। মালাউনের বাচ্চা। তোরা তো নাস্তিক”। সবাই বলতে শুরু করে, আমরা নাকি ধর্ম অবমাননা করেছি। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাকে ঘুসি মারে একজন। তারা আমাদের বাসার সামনের অংশে ভাঙচুর চালায়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ। আমি উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সঙ্গে আছি, লেখালেখি করি, নাটক করি। উত্তরায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির সভাপতি ছিলাম আমি। সে সময় প্রতিক্রিয়াশীলরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন ও শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে। কিন্তু আমি আয়োজন থেকে পিছিয়ে যাইনি। এ নিয়ে আমার ওপর তাদের রাগ আছে। আমার স্ত্রী ফাহমিদা হক বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি উত্তরায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি। এসব কারণে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের ওপর হামলা করেছে।’

হামলার বিষয়ে অধ্যাপক রতন সিদ্দিকীর মেয়ে পূর্ণাভা সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাসার ফটকের সামনে সবজির ভ্যান ও মোটরসাইকেল রেখে সড়ক আটকে রাখা ছিল। সেই সঙ্গে মুসল্লিদের অবস্থানের কারণে পুরো সড়ক প্রায় বন্ধ ছিল। তখন গাড়িচালক হর্ন দেওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বাবা গাড়ি থেকে নেমে কথা বলতে গেলে তাকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং পেটে আঘাত করা হয়। মায়ের কপালে টিপ দেখে হামলাকারীরা সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলে। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর নম্বরে কল করেও সাড়া পাইনি। পরে পরিচিত পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তাদের কল করি। আর পুলিশ আসার পর হামলাকারীরা বলে, সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুমার নামাজের সময় তারা (রতন সিদ্দিকী ও তার স্ত্রী) গাড়ি নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। বাসার প্রধান ফটকে একটি মোটরসাইকেল রাখা দেখে তাদের গাড়িচালক হর্ন বাজান। তখন সামনের মসজিদ থেকে এসে একজন মুসল্লি বিষয়টি নিয়ে তর্কে জড়ান। এর জের ধরে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় হয়তো ড. রতন সিদ্দিকীর শরীরে আঘাত লেগে থাকতে পারে। তিনি এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

রতন সিদ্দিকী ও তার স্ত্রীকে হেনস্তার নিন্দা জানিয়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা সভ্য দেশে এরকমটা তো চলতে পারে না। একজনের বাসার গেট বন্ধ করে সবজির ভ্যান বসানো হবে, বাইক রাখা হবে। তিনি সেটি সরাতে বললে তার ওপর ধর্মীয় উসকানি দিয়ে হামলা করা হবে, এটা তো চলতে পারে না। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। হামলাকারীদের বিচার করতে হবে।’

রতন সিদ্দিকী দম্পতির ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘বাসার গেটের সামনে ভ্যানে সবজির দোকান বসানো এবং গাড়ি রাখাকে কেন্দ্র করে বচসার শুরু। তা থেকে রতন সিদ্দিকীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ছাড়াও তার স্ত্রী উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সদস্য নাট্যকর্মী, শিক্ষক ফাহমিদা হক কলিকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং অধ্যাপক রতন সিদ্দিকীর বাসার দারোয়ান ও গাড়িচালককেও মারধর করেছে একদল দুর্বৃত্ত। নামাজের সময় বাধা সৃষ্টি করার ভুয়া অভিযোগ তুলে এসব তাণ্ডব চালিয়েছে মৌলবাদীরা।’

এক বিবৃতিতে অধ্যাপক বদিউর রহমান ও অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘উদীচী এ ধরনের জঘন্য হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং এ ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে জড়িত সবার দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। এছাড়া অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী এবং তার পরিবারের সদস্যদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা হলে সব প্রগতিশীল মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’