জাতীয় সংসদের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ-সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন হয়েছিল সাড়ে চার বছর আগে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়েও শুনানি শুরুর উদ্যোগ নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ ইস্যুতে ধোঁয়াশা।
শিগগিরই রিভিউ শুনানি শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিন।
এর আগে গত বছর নভেম্বরে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে একটি বিলের পাসের আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছিলেন, শিগগিরই শুনানি শুরু হবে।
রিভিউ শুনানির প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত এসেছে রাষ্ট্রপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের কাছ থেকে। সংশ্লিষ্ট রিট মামলার বাদীপক্ষের আইনবিদেরা বলছেন, এ বিষয়ে কিছু আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। এছাড়া আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতিসহ সাতজনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে রিভিউ শুনানি হতে হবে। এখন আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতিসহ ছয়জন বিচারপতি (একজন বিচারপতি ছুটিতে রয়েছেন)।
এ অবস্থায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে কী নেই তা নিয়ে যেমন নানা মত রয়েছে তেমনি অসদাচরণের অভিযোগে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে সেটাও স্পষ্ট হয়নি। গত ৩৪ মাস বিচারকাজের বাইরে থাকা হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক এ দুই প্রশ্নে। এ দীর্ঘ সময়েও স্পষ্ট হয়নি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান বা তদন্তের অগ্রগতি কতদূর। এমন পরিস্থিতিতে সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয়ের সুরাহা প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনবিদেরা।
২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়া হলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল হয়ে যায়। পরে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন হয়। ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই সাত বিচারপতির আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেয়। ফলে বহাল থাকে হাইকোর্টের রায়। পরে এই রায় রিভিউ চেয়ে ওই বছরের ডিসেম্বরে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে অসদাচরণের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট থেকে বিচারকাজের বাইরে রয়েছেন হাইকোর্টের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক। ওইদিন থেকে তারা ছুটিতে রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে হাইকোর্টের বিচারকদের তালিকায় এখনো তিন বিচারপতির নাম রয়েছে। এর মধ্যে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর নাম রয়েছে সবার ওপরে।
ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিভিউ আবেদন শুনানি করতে হলে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আবেদন করতে হবে। চেম্বার আদালত যখন বলবে তখন শুনানি হবে। যতদূর জানি, রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে কোনো আবেদনই করেনি। এছাড়া শুনানি করতে গেলে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। এখনো এ প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি, তাহলে কীভাবে শিগগির শুনানি হবে? আসলে এগুলো (শিগগির শুনানি) বলার জন্য বলা।’
তিন বিচারপতির প্রশ্নে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত রিভিউ শুনানি নিষ্পত্তি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এ পদ্ধতি তো অনেকেই মানছেন না।’
তবে ভিন্নমত জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিভিউ শুনানির জন্য চেম্বার আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি তো পুরনো মামলা। ওনারা (আপিল বিভাগ) ইচ্ছা করলে সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি করতে পারেন। সেটি কালকেও কিংবা এক সপ্তাহ পরেও হতে পারে। তাই আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। শেষ কথা বলবেন সর্বোচ্চ আদালত।’ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে এখন কিছু বলতে চাইছি না। যেহেতু ওনারা (আপিল বিভাগ) একটা রায় দিয়েছেন, সে রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করেছি। এখন রিভিউ শুনানি না হওয়া পর্যন্ত বলতে পারব না এটা আছে কী নেই। আশা করি তাড়াতাড়ি শুনানি করে আপিল বিভাগ একটা সিদ্ধান্ত নেবেন। তারপরই আমরা বলতে পারব এবং সব প্রশ্নই তখন শেষ হয়ে যাবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমস্যাগুলো সাংবিধানিক এবং এগুলোর সুরাহা করতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এটিও একটি প্রশ্ন যে, এটি (সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল) বহাল রয়েছে কি-না। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো সমস্যার যখন উদ্ভব হয় তখন যদি বিষয়টি সেখানে পাঠানো হতো তখন ধরে নিতাম যে এটি আছে। কিন্তু সে ধরনের কোনো পরিস্থিতি এখনো দেখিনি। আবার রিভিউ আবেদনটি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন যদি এ পরিস্থিতি আসে তখন কী হবে? আমার মনে হয় এ সমস্যাগুলোর দ্রুত সুরাহা হওয়া উচিত।’
ব্যারিস্টার শফিক আরও বলেন, ‘সবারই বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যেহেতু সর্বোচ্চ ক্ষমতা আছে, চাইলে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হাইকোর্টের ওই তিন বিচারপতির বিষয়ে কোনো সমাধান বাতলে দিতে পারেন।’
ষোড়শ সংশোধনীর মামলায় আপিল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনবিদ ও সংবিধান বিশ্লেষক ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাতিল হয়ে গেছে। এই রায় এখনো বলবৎ আছে। এখন রাষ্ট্রপক্ষ যদি রিভিউ শুনানি করতে চায় তাহলে অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে আদালতকে বলবেন। রিভিউটি আগে নিষ্পত্তি হতে হবে। নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে কী নেই।’