ভেবেছিলাম শিলচর শহরের ভয়াবহ বন্যা নিয়ে লিখব। এমনিতেই আসাম নিয়ে অনেক দিন কিছু লিখি না। তারপর আবার বরাক উপত্যকা সম্বন্ধে কেউই কখনো খুব বেশি লেখালেখি করে না। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা বলে মূলধারার আসাম চুপ করে থাকে। আর কলকাতা নাক উঁচু বলে কোথায় কোন শিলচর, করিমগঞ্জ, বদরপুর সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন মনে করে না।
অথচ চমৎকার শহর এই শিলচর। কিছুটা যেন উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির সঙ্গে মিল আছে। শিলচরেও কেমন শহরের মধ্য দিয়ে নদী বয়ে যায়। প্রথমবারের শিলচর দেখার রোমাঞ্চ অবশ্য হালে, কয়েক বছর ধরে পেতাম না। বড় দ্রুত অন্যান্য সব শহরের মতোই শিলচর বদলে যাচ্ছিল। বড় বড় ফ্ল্যাট, শপিং মল, নতুন নতুন আধুনিক গাড়ি সব মিলিয়ে তার গায়েও আধুনিকতার ছোঁয়া স্পষ্ট হচ্ছিল। আমাদের আধুনিকতার মানে হচ্ছে তথাকথিত উন্নয়ন। যে উন্নয়নের অর্থ হচ্ছে প্রকৃতি ধ্বংস করে, সাধারণ লোকের কথা কিছুমাত্র চিন্তা না করে অপরিকল্পিতভাবে, যেনতেন প্রকারে পশ্চিমি মডেলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা।
তার ফলে সর্বত্রই প্রতিবছর কোথাও না কোথাও বিপর্যয় নেমে আসছে। বন্যা, ধস, ভূমিকম্প সব আলাদা আলাদা কারণ হলেও মূলটা নিশ্চিত অপরিকল্পিত উন্নয়ন। শিলচর বলছি বটে কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে সিলেটে এবার যে ভয়ংকর বন্যা হলো তার পেছনেও কারণ সেই একই। সত্যি কথা বলতে পরিবেশ, প্রকৃতি এসব নিয়ে আমরাও সেভাবে কয়েক বছর আগেও চিন্তা করিনি। বন্যা হতো। গ্রামের পর গ্রামের জলভাসি ছবি দেখে আমরা একটু আধটু দু-একদিন আহা উহু করতাম, ব্যস ওইটুকুই। এখন যখন শহর ডুবছে তখন গেল গেল রব উঠছে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি পরিবেশ আন্দোলন এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ওই নির্দিষ্ট এক দিনে গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান বা একটি গাছ একটা প্রাণ এসব শৌখিন লোক দেখানো সেøাগানে আর যাই হোক প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচার রাস্তা হতে পারে না।
বিপর্যয় এলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ লোক। মুম্বাই শহরে বড়সড় বন্যা হলে, বলিউড তারকাদের বাড়ি এক আধবার জলে ডুবলে তা নিয়ে মিডিয়া হইচই করে, কিন্তু কতশত গরিবের সংসার সারা জীবনের মতো ধ্বংস হয়ে যায় কে আর তার খবর রাখে! এবার শিলচর, সিলেটে মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও বন্যা চূড়ান্ত জটিল হয়ে দেখা দিয়েছিল। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরেও অনেক দিন অবধি কোথাও হাঁটু, কোথাও বুক, কোমরসমান জল ছিল। কিছু কিছু এলাকায় দোতলা বাড়ির ভেতরেও জল ঢুকে পড়েছিল। না ছিল বিদ্যুৎ, না ইন্টারনেট, ফোন, ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমাদের আধুনিকতা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
চোখে আঙুল দিয়ে এবারের বন্যা দেখিয়ে দিল যে জমা জল নিষ্কাশনের সব রাস্তাই উন্নয়নের নামে সরকারের নীতি বন্ধ করে দিয়েছে। খাল, বিল, নদীনালা যেখানে যা ছিল সব বুজিয়ে স্কাইস্ক্রাপার উঠেছে। শপিং মল হয়েছে। স্বাভাবিক পরিবেশ-প্রতিবেশের পথ আটকে আমরা আধুনিক হতে চেয়েছি। প্রতিবছর বিপর্যয়ের পর পারস্পরিক দোষারোপ চলতে থাকে। আমরা দোষ দিই পড়শি দেশকে, তারা নদীমুখ বন্ধ করে বড় বাঁধ দিয়েছে বলেই অবস্থা এমন মারাত্মক হয়েছে। পড়শি দেশ আবার একই অভিযোগ আনে আমাদের বিরুদ্ধে।
বস্তুত পড়শি দেশের সঙ্গে আমাদের সময় সময় সম্পর্কের অবনতির অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে জল। সিন্ধুর জল নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বিবাদ। ফরাক্কা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মন কষাকষি। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুপ্রধান নেপালের সঙ্গেও ঝগড়া বিবাদ কোশী বাঁধ নিয়ে। আমরা আজকাল কথায় কথায় গ্লোবাল শব্দটি আওড়াই। পুঁজির কোনো সীমানা নেই। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার নিয়ে আমরা কখনো অন্য দেশের সুবিধে অসুবিধে নিয়ে ভাবি না।
এবার সিলেটের বন্যা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে যে ভারতের উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্যে বড় বাঁধ নির্মাণের ফলেই সিলেট, কুড়িগ্রাম ও অন্যান্য এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়াও মেঘালয়ের খোলামুখ কয়লাখনির কারণে যে ভূমিক্ষয় তাও এবার বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
মেঘালয়ের খোলামুখ কয়লাখনি আমি দেখেছি। অধিকাংশ খনিই বেআইনি। মুনাফার লোভে যেখানে সেখানে গাছ কাটা হয়েছে। ভূমিক্ষয় অপরিহার্য গাছ কাটলে। এটা বোঝার জন্য প-িত না হলেও চলে। অরুণাচল প্রদেশের সুবনসিরি নদীর ওপর যে বিশাল বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে তা নিজেই দেখেছি। একটা সময় ছিল যখন এসব নিয়ে অন্য সব শহুরে লোকের মতোই আমিও কিস্যু জানতাম না। মাথাও ঘামাতাম না। কিন্তু আসামের একাধিক প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ প্রথম আমাকে সুবনসিরি নদীর বাঁধ নিয়ে সতর্ক করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে ডকুমেন্টারি করতে গিয়ে চমকে গিয়েছিলাম। সরকারের যে পরিবেশ গাইডলাইন তাও কিছুমাত্র না মেনে বিপুল কর্মকাণ্ড চলছে। ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুষ্প্রাপ্য গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলা চলছে।
আসাম, অরুণাচলের ওই সীমান্ত এলাকায় মিসিং জনজাতির বাস। এই বাঁধ তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলেছে। সুবনসিরি মানে গোল্ডেন রিভার। লোকবিশ্বাস এখানে একদা সোনা পাওয়া যেত। সত্যি মিথ্যে জানি না। তবে এখানে অজস্র মাছ ছিল, যা স্থানীয়দের রুজি রোজগারের বড় সম্বল। বাঁধ তাও কেড়ে নিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। আসামে ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে কয়েক হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। বুড়ো মানুষদের স্মৃতিতে তা আজও রয়ে গেছে। এখন যদি ভূমিকম্প হয় তাহলে বাঁধে সামান্য চিড় ধরলেও আসামের বিস্তৃত এলাকা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।
চীন ঠিক একই কাজ করছে ব্রহ্মপুত্র নদের মুখে বড় বাঁধ নির্মাণ করে। আসলে সব দেশ এখন অতি জাতীয়তাবাদী হতে চায়। ভোটের কথা ভেবে। ফলে আন্তর্জাতিকতা এখন নিছক আভিধানিক শব্দ। পরিবেশ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায়। কিন্তু এটুকু তো সবারই আগে বুঝতে হবে যে, জল মানে না সীমানার বেড়াজাল। বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি হয় তা হবে জলের জন্য। প্রাকৃতিক সম্পদ এখন দ্রুত বেসরকারিকরণ হচ্ছে। মুনাফার লোভে এদেশে নদীও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
এক একটা ওয়াটার পার্কের জন্য কত লিটার জল খরচ হয় তা খোঁজখবর নিলে সবাই জানতে পারবেন। ইচ্ছে আছে ভারতের জল বেসরকারিকরণ নিয়ে পরের কোনো এক সপ্তাহে বিস্তারিত লেখার। শিলচর, সিলেট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি ও এলিট জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নিয়ে আদেখলেপনা, তার সঙ্গে পরিবেশ নিয়ে চেতনার অভাব আজকের সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মূল কারণ।