আসছে ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ের আগাম টিকিট বিক্রির গতকাল রবিবার ছিল তৃতীয় দিন। এদিন সকাল ৮টা থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হয় ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। ট্রেনে যাত্রা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় বেশিরভাগ যাত্রীরই চাহিদা থাকে এই বাহনটির টিকিটের। আর বাড়তি এই চাহিদার কারণে অনেক সময়ই মেলে না ট্রেনের টিকিট। যে কারণে অনেকেই এই টিকিটকে ‘সোনার হরিণ’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। সেই ‘সোনার হরিণ’ পাওয়ার আশায় আগের দিন শনিবার রাত থেকেই স্টেশনে ভিড় করতে শুরু করেন টিকিটপ্রত্যাশীরা। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ঈদের অগ্রিম টিকিট কাটতে পারেননি বেশিরভাগ টিকিটপ্রত্যাশী। অনলাইনেও টিকিট বিক্রি দুই মিনিটেই শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন টিকিটপ্রত্যাশীরা। রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ জানায়, এবার ৫ থেকে ৯ জুলাইয়ের যাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছে রেলওয়ে। টিকিট বিক্রি চলবে ৫ জুলাই পর্যন্ত। ফিরতি টিকিট বিক্রি হবে ৭ জুলাই থেকে। মোট টিকিটের অর্ধেক বিক্রি হবে ওয়েবসাইটে এবং অ্যাপের মাধ্যমে বাকি টিকিট বিক্রি করা হবে সরাসরি কাউন্টারে। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ অভিমুখী একটি ঈদ স্পেশাল সার্ভিস এই প্রথমবারের মতো চালু করা হচ্ছে। ঢাকার মোট ৭ জায়গায় এই ঈদ স্পেশাল সার্ভিসের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। গতকাল থেকে ঈদের স্পেশাল ট্রেনের টিকিটও দেওয়া শুরু করেছে রেলওয়ে।
গতকাল সরেজমিনে কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনের টিকিট বিক্রির তৃতীয় দিনেও ভোগান্তির সেই পুরনো চিত্র দেখা গেছে। টিকিট নামের সোনার হরিণ পেতে অপেক্ষা ১২ থেকে ২০ ঘণ্টার। অনেকে লাইনে দাঁড়িয়েও চেষ্টা করেছেন অনলাইনে। তবে বেশিরভাগ টিকিটপ্রত্যাশী ৭ তারিখের টিকিট না পেয়ে ৮ তারিখের টিকিটের জন্য ফের লাইনে দাঁড়িয়েছে।
৭ জুলাই বগুড়া যাওয়ার অগ্রিম টিকিটের জন্য শিক্ষক মো. এমদাদুল হক গত শনিবার রাত ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন কমলাপুর স্টেশনে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রেনে পরিবার নিয়ে খুব সহজে ভ্রমণ করা যায়। ঈদে বাড়ি যাওয়ার জন্য শনিবার রাত থেকেই আছি স্টেশনে। কিন্তু ১৬ ঘণ্টার মতো সময় হয়ে গেছে, এখনো টিকিটের কোনো খবর নেই। তাই কালকের (আজ সোমবার) জন্য অপেক্ষা করছি। যদি টিকিট পাওয়া যায়।’
নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন পঞ্চগড়ের ফরহাদ হোসেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একটা টিকিটের জন্য কারখানা থেকে শনিবার রাত থেকে এসে বসে আছি। কিন্তু টিকিটের দেখা নেই। প্রতি বছর ঈদ এলে এই টিকিটের জন্য এই রকম হয়রানিতে পড়তে হয়। দুই ঘণ্টার মধ্যে সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। এত টিকিট যায় কোথায়?’
আরেক টিকিটপ্রত্যাশী মো. রায়হান বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটে। এত দূরে বাসে যাতায়াত করা খুব কষ্ট। আর ঈদের সময় বাসেও ডাবল ভাড়া লাগে। তাই ট্রেনের টিকিটের আশায় এলাম স্টেশনে। কিন্তু এই টিকিট তো কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না। আর কত সময় লাইনে দাঁড়াতে হবে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।’
এদিকে ট্রেনের টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা দাবি করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ নিরাপদে বাড়ি যাওয়ার জন্য ট্রেন যাতায়াত সহজ ও সাশ্রয়ী মনে করে। তার জন্য বেশিরভাগ যাত্রী চায় ট্রেনে করে গ্রামের বাড়ি যেতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় রেলের জন্য এত কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তার যাত্রীসেবার মানে এখনো গাফলতি দেখা যায়। আর ঈদের সময় ঠিকমতো ট্রেনের টিকিটও পায় না যাত্রীরা। এত টিকিট যে থাকে সেগুলো যায় কোথায়? তাই সরকারের উচিত এই টিকিট বিক্রির স্বচ্ছতায় আরও ভালোভাবে নজর দেওয়া। তা না হলে এই সমস্যার সমাধান থেকে যাত্রীরা মুক্তি পাবে না।’
কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার জানান, গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত স্টেশনের কাউন্টারে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ টিকিট এবং অনলাইনে ৫ হাজার ৮০০ টিকিট বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) ঈদের স্পেশাল ট্রেনের টিকিটও দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু ট্রেনের সংখ্যা সীমিত এবং আসন নির্দিষ্ট, ফলে সবাইকে আমরা টিকিট দিতে পারছি না। এখন মোট ২৯ হাজার ৭০০ টিকিটের মধ্যে অর্ধেক কাউন্টারে এবং অর্ধেক অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। তবে রেলওয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে যারা ট্রেনে ভ্রমণ করবে তারাই যেন শুধু টিকিট কাটে। টিকিট যার ভ্রমণ তার, এই চেষ্টাই আমরা করছি।’