ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ব্যাংকগুলোর ততই নগদ টাকার টান পড়ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে নগদ টাকা ধার নিতে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। গতকাল বুধবার কলমানি মার্কেটের গড় সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বিগত মাসগুলোতে কখনোই কলমানি মার্কেটের এক দিনের ধারের গড় সুদহার এই পর্যায়ে আসতে দেখা যায়নি। গত রোজার ঈদের সময় এক দিনের কলমানির গড় সুদহার ছিল সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার এক দিনের কলমানির সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৬ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। গড় সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এদিন কলমানি মার্কেট থেকে এক দিনের জন্য ধার দেওয়া-নেওয়া হয় ১৬৬ বার। লেনদেন হয় মোট ৮ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা।
এর আগের দিন মঙ্গলবার কলমানি মার্কেটে এক দিনের জন্য টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া হয় ১৪৮ বার। লেনদেন হয় ৯ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৬ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ৪ শতাংশ। গড় সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ব্যাংকগুলো বলছে, আগামী ১০ জুলাই কোরবানি ঈদ পালিত হবে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ঢাকাসহ কিছু এলাকায় আংশিকভাবে ব্যাংক খোলা থাকলেও পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাংক খোলা থাকবে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। এ কারণে গ্রাহকরা যাতে কোরবানির পশু কেনার টাকা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেন, সেজন্য ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে হাতে রাখছেন। এতে ব্যাংকের প্রতিদিনের লেনদেনে নগদ উত্তোলনের চাপ বেড়েছে। ফলে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা সরবরাহ করতে ব্যাংকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কলমানি মার্কেটের শরণাপন্ন হচ্ছে। বেশিরভাগ টাকাই এক দিনের জন্য ধার করছে ব্যাংকগুলো।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল বুধবার এক দিনের জন্য কলমানি থেকে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ধার নেয় ব্যাংকগুলো। কিন্তু এক দিনের বেশি (৬ দিন থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত) কলমানি লেনদেনের পরিমাণ ছিল মোট ১ হাজার ১০ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার ব্যাংক শাখা রয়েছে। এই শাখাগুলোতে মোট আমানত রয়েছে ১৪ লাখ কোটি টাকার বেশি। তবে কোনো ব্যাংকের শাখায় দৈনিক লেনদেনের চাপ বেশি থাকলে ওই শাখা প্রথমে তার নিজস্ব ব্যাংকের কাছাকাছি অন্য শাখা থেকে নগদ টাকা সংগ্রহ করে গ্রাহকের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কাছাকাছি শাখায় পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে ওই ব্যাংক অন্য কোনো ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়ার জন্য টেলিফোনে যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সুদে এক রাতের জন্য এই টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া করে ব্যাংকগুলো। এটাই কলমানি মার্কেট হিসেবে পরিচিত। গত মার্চে এই মার্কেটকে অনলাইনে নিয়ে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সাধারণত ঈদের আগে কলমানি মার্কেটে ধার নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তবে এতদিন ব্যাংকগুলোর কাছে বাড়তি তারল্য থাকলেও এখন তা কিছুটা কমেছে। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকগুলো বলছে, করোনা মহামারীর প্রকোপ কমে আসায় আমদানি বাড়তে শুরু করেছে। আমদানি ব্যয় ডলারে পরিশোধ করতে হয়। তাছাড়া বেসরকারি খাতের ঋণও বেড়ে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো এবারের কোরবানির ঈদের আগে কিছুটা নগদ টাকার সংকটে থাকায় কলমানিতে ঝুঁকেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক সপ্তাহ আগেও এক দিনের কলমানি মার্কেটে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হতো ৬ হাজার কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে ৯ হাজার কোটি টাকায় উঠে এসেছে। গত রোজার ঈদের আগে এক দিনের কলমানি মার্কেটের লেনদেন ছিল গড়ে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে মোট তারল্য ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। ফলে তখন ব্যাংকগুলোকে কলমানির ওপর তেমন নির্ভর করতে হতো না। সুদের হারও বেশি বাড়ত না। এবার তারল্য কমে আসায় ঈদের আগের টাকা তোলার চাপ সামলাতে কলমানির ওপর ব্যাংকগুলোকে বেশি নির্ভর করতে দেখা যাচ্ছে।